আজকের গল্প - বাংলা ভাষা
কলকাতায় ছেলেপুলে আজকাল বাংলা বলে না - এইকথাটা বেশ শুনি এখন, নিজেও লক্ষ্য করেছি। তবে কলকাতার লোকজনের জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলা কিছু নতুন নয়। লীলা মজুমদার লিখে গেছেন এদের কথা অনেক, যারা বাবুর্চিকে “borchi” বলত, (“সপ্তপদী”তে রিনা যেমন “আয়া” বলে ডাকত), আরও অনেক বিকট শব্দ বলতো কাজের লোকদের সঙ্গে যেটা একটা হিন্দি মেশানো ভাষা। বাবা-মা দের সঙ্গে তারা ইংলিশ বলত। আরও পেছনে গেলে দেখা যাবে যে Young Bengal এর ছেলেপুলেও বাড়িতে ইংলিশ বলত। আজকেই আমার বন্ধুরা রাগারাগি করছিল বাংলায় “কেন কি”, “খুশি পান”, “খাবার লাগিয়ে দেওয়া” কথাগুলো নিয়ে। কানে বীভৎস লাগে আমাদের এই কথাগুলো। বাংলা ভাষার দুরবস্থা নিয়ে ভাবতে গেলে আমার আগে বাঙালি জাতির দুরবস্থা বেশি চোখে পড়ে - বা দুটোই একে ওপরের সঙ্গে মিশে থাকা একটা ব্যাপার। বাংলাকে বা জাতিকে টেনে তোলা আমার কাজ নয়। অর্ণব আমায় বলেছে - “মিনি আর কিটি ছাড়া পৃথিবীর আর কাউকে তুমি কিছু করতে পারবে না।” হক কথা। তো আমি তাই বাংলা ভাষা আর বাঙালি জাতির উত্থানের কাজটা বাড়ি থেকেই শুরু করলাম।
মিনির ধারণা পৃথিবীতে একটাই “ভদ্রলোকের” ভাষা আছে সেটা হল ফরাসি। ইংলিশটা ও বলে কারণ ওইটা একটা “কাজ চালাবার” ভাষা। বাকি আর কোনও ভাষা বলবার যোগ্য নয়। বাংলা শুনে কেমন একটা নাক কুঁচকেছিলো, বলিউড এর পাঞ্জাবি মেশানো হিন্দি গান শুনে actually পালিয়ে গিয়েছিল এই বলে - “they don’t even speak French?” যেদিন বলল ও বাংলা বলেনা কারণ “it doesn’t have any English words in it” সেদিন আমি বুঝলাম আমায় নিজের হাতে এবারে ব্যাপার নিতে হবে। নামালাম সহজ পাঠ।
রবীন্দ্রনাথকে মানুষে জীবনের নানা অবস্থায় নানা ভাবে উপলব্ধি করে। আমি ওঁকে নতুন ভাবে জানলাম সহজ পাঠ পড়াতে গিয়ে। প্রথমে দেখলাম একটা গোটা বই তাতে যুক্তাক্ষর নেই। কিন্তু তার কবিতা, গল্প সব গুলোর শুধু যে মানে আছে তাই নয়, অপূর্ব মানে আছে। ফরাসি-প্রেমীও দেখলাম কৌতূহলী হচ্ছে। যদিও আমি জন্মেও কোনওদিন ভাবিনি সহজ পাঠ ইংলিশ এ translate করার দরকার হতে পারে, দেখলাম নিজেই তাই করছি। চলল আমাদের বাংলা পড়া - খ, ঘ, ভ - এগুলোর উচ্চারণ ক, গ, ব এর মতো শোনায়। একদিন মিনি বলতে চাইল ভাত, আমি শুনলাম বাট (butt)! তাও আমি Herr Oberst এর মত পুরোপুরি না হলেও যথেষ্ট মিলিটারি কায়দায় পড়িয়ে চললাম বাংলা। সঙ্গে সঙ্গে pep talk। বাংলা পড়লে কত গল্পের বই পড়তে পারবে, কত characters, কত plot, কত history, social drama জানতে পারবে। ভদ্রমহিলা গল্প পড়তে পছন্দ করেন, তাই একটু এগোলাম।
এর মধ্যে একদিন - গুপি গাইন বাঘা বাইন দেখলাম। পুণ্যলতা রাও এর “ছোট্ট ছোট্ট গল্প” থেকে সত্যজিৎ রায়ের আঁকা ছবি দেওয়া christmas এর গল্প পড়ে দিলাম। ওইটা কি আশ্চর্য ভাবে ice break করল। তারপরে দেখি মহিলা সহজ পাঠ এর প্রথম আর দ্বিতীয় খণ্ড পড়ার ঘর থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজের ঘরে রেখে দিয়েছেন। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে নেড়েচেড়ে দেখছেন। বুঝলাম রাস্তা ঠিক আছে। আবার পড়াতে লাগলাম, এবারে আ-কার, ই-কার এর পালা, আরেকটু এগোল। তারপরে ধরিয়ে দিলাম লেখা। এখন একটা একটা করে বাংলা হরফ লিখছে আর অদ্ভুত কথা বলছে। প নাকি সাঁতার কাটছে নীচের দিকে তাকিয়ে, অনুস্বর দেখে বলল - “MumMum, in French this is called a line oblique.” আচ্ছা বেশ, জানলাম। তবে এখন নিজেই বেশ খুশি। “কালো রাতি গেল ঘুচে..” কবিতাটা বলে, “প্রভাতী” আর “নোটবই” শিখতে চেয়েছে। আজকে আমার কাছে অল্প অল্প শুনেছে মাতৃভাষা কাকে বলে আর মাতৃভাষা দিবস কেন পালন করা হয়। ফেলুদার background music টায় French শব্দ বসিয়ে গান করে আর একটা step-stool দেখে বলল, “maybe বরফি put that there?” বুঝতে পারছি বাঙালীয়ানাটা আস্তে আস্তে ঢুকছে। যে মানুষকে আবোল-তাবোল বুঝিয়ে বলতে হবেনা, আর যে বাংলার বিরাট সাহিত্য সম্পদের সামনে খোলা মনে এসে দাঁড়াতে পারবে।
Comments
Post a Comment