আজকের গল্প - আমার আপ্পাদাদুর বাড়ি
আমার আপ্পাদাদুর বাড়ি
১৯২৭ সালে দক্ষিণ কলকাতার (তখন এদিকটাকেই দক্ষিণ বলত) ল্যান্সডাউন রোডের ওপর আমার আপ্পাদাদু একটা বাড়ি করেছিলেন। নিতান্তই গেরস্থ মানুষের থাকবার মতো দোতলা বাড়ি, সামনে রাস্তার দিকে পুবমুখো টানা লম্বা বারান্দা, নীচে বসার ঘর, ভেতর দিকে লম্বা দালানে সবাই বড়ো বড়ো কাঁসার থালা পেতে খেতে বসত সবাই, বিখ্যাত ভিখিরি-ঠাকুর রাজ করতো রান্নাঘরে। দোতলায় তখনকার দিনের ধরণে একটা শ্বেতপাথরের ঘর আছে যেটা এখনকার ভাষায় master bedroom। আমরা বলি “পাথর ঘর”। আর বাকি অনেক ঘর, দালান, বারান্দা, ছাদ এখন ওখান ছড়িয়ে রয়েছে।
আমরা কিছু উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ি নই মিত্তির, মল্লিক, বা লাহাদের মত। কিন্তু আজকাল যেখানে সব বাড়ি ভেঙে ভেঙে এক রকম দেখতে ফ্ল্যাট হয়ে যাচ্ছে সেখানে শহরে কটা বাড়ি আছে যেখানে ৫ generation থাকে? আপ্পাদাদু বলতেন এমন বাড়ি করে যাব যে আমার নাতিরা থাকবে। ওঁর নাতিরা তো থাকলেই, তাদের নাতনীরাও এখন আসছে ঘুরছে ফিরছে। কাল মিনি নীচে কাকাভাইয়ের ঘরে একটা খাটের ওপর লাফালাফি করছিল, সেইটা আপ্পাদাদুর খাট। আমি মামকে বললাম যে আপ্পাদাদু আমার মেয়েদের মতো ভয়ানক পাজি বাচ্চা খাটে লাফাচ্ছে দেখে কি ভাবছে কে জানে! মাম বলল, কিছু ভাবছে না, হাসছে।
পিসিমণির সঙ্গে সঙ্গে মিনি সিঁড়ি দিয়ে ধরে ধরে নামছিল, আমার মনে হল দেখে মিনির বয়েসে পিসিমণিও ঠিক ওই সিঁড়ি দিয়েই ধরে ধরে নামতে শিখেছিল একদিন। বারান্দায় আমরা যেখানে গাড়ি দেখতাম, ছাতে যেখানে সাইকেল চালাতাম মিনি-কিটি সেখানে ঘুরছে।বাবা-কাকুনরা দালানে যেখানে ফুটবল খেলত সেখানে মিনি-কিটি দের একটা ফুটবল কাল রাখা ছিল। কিটি ঠিক আমার মত কাক দেখে খুশি হচ্ছে। দিদিভাই ছবি গুলো দেখে বলল - পুরনো বাড়িতে নতুন মানুষ - কি অদ্ভুত একটা feeling! এক একটা ঘরে কোনটায় ছোড়দাদু থাকত, কোনটায় বাবাদের বড়ো পিসিমা থাকতেন আজ সেখানে ভল্লুর খেলনা রাখা, আমার ৪ বছর বয়েসের কেনা গদার সঙ্গে কাল মিনি-কিটি দের একটা করে গদা রাখা হল।
একটা বাড়ি ইঁট-কাঠ-লোহা-লক্কড়ের ওপরে উঠতে পারে তখনই যখন প্রায় ১০০ বছর পরেও ওই সবুজ দরজা গুলো দিয়ে ঢুকলে মনে হয় “অন্তরগ্লানি সংসার ভার” সব বাইরে রয়ে গেল।
মা বলছে আপ্পাদাদু আর যারা একসময়ের বাসিন্দা ছিল তারা ভাববে ভল্লু-মিনি-কিটি দের দেখে "কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি…নতুন নামে ডাকবে, আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।"

Comments
Post a Comment