আজকের গল্প - “কাশি-ধাম”

 আমাদের কলকাতার বাড়িতে সব সময়ে ডজন খানেক লোক থাকত, আর তাদের যে নানা সময়ে নানা রোগ হত সেটা বলাই বাহুল্য। একবার আমাদের সবার লাইন দিয়ে ম্যালেরিয়া হয়েছিল। তার কিছুদিন পরে কর্পোরেশন থেকে মশা মারার তেল দিতে দুজন আসেন। তাঁরা আমাদের চৌবাচ্চা দেখে চোখ কপালে তুলে আমার দাদু (দাদুন) কে বলেন - “এ কি করে রেখেছেন মশাই! এতো মশার আড্ডা! বাড়িতে সবার ম্যালেরিয়া হবে!” তার উত্তরে দাদুন সগর্বে বলেন, “বাড়িতে সবার ম্যালেরিয়া হয়ে গেছে!” সেই সময়ে আমরা সবাই ম্যালেরিয়া expert হয়ে গিয়েছিলাম, লোকের blood report পড়ে আমরাই বলে দিতে পারছিলাম কার সাধারণ ম্যালেরিয়া আর কার malignant ম্যালেরিয়া। এমনকী কত dose এ কোন ওষুধ খাওয়া ভালো সবই আমরা জানতাম।

আর একবার আমাদের কাশি হয়েছিল বোধহয় সবার একসঙ্গে। সারাদিন আমাদের chorus এ কাশি শোনা যাচ্ছিল। প্রত্যেকের নিজস্ব কাশির আওয়াজ, তার সঙ্গে বসে যাওয়া গলা, কারুর সর্দি বসা স্বর, কারুর ভাঙা গলা - সে সব মিলিয়ে অপূর্ব ধ্বনি। আবার সর্দির প্রভাবে কারুর কান বন্ধ। সে অন্যের বসা গলা শুনতে পাচ্ছে না, অন্যজন রেগে যাচ্ছে কিন্তু চেঁচাতে চেষ্টা করেও পারছে না! সেই কাশি অনেকদিন ধরে শুনে আমার ছোট কাকিমা (মাম) বলেছিল - আমাদের বাড়ি কাশি-ধাম হয়ে গিয়েছে!

সর্দিকাশির কথা বলতে গিয়ে বাড়িতে যে ডাক্তাররা আসতেন তাঁদের কথাও মনে হচ্ছে। একজনের কথা আমরা শুনি, কিন্তু আমরা তাঁকে দেখিনি তিনি হলেন স্বনামধন্য “হরিতোষ বাবু”। যাঁকে আমার পিসিমণি ছোটবেলায় “হরি ঘোষ” বলতো। (আমরা যখন ঘোষ তখন নিশ্চয়ই পৃথিবী শুদ্ধ সবাই ঘোষ - এরকমই একটা logic বোধহয় ব্যবহার করা হয়েছিল।) তারপরে হলেন “অরবিন্দ ডাক্তার”। বসতেন একটা ওষুধের দোকানে যার নাম “অমৃত”। এই ওষুধের দোকানের কথায় আসছি একটু পরে। অরবিন্দ ডাক্তার বেজায় সুপুরুষ দেখতে ছিলেন, বয়ষ্ক সৌম্য চেহারা কিন্তু বেজায় ট্যারা। একবার দাদুনকে দেখতে এসেছিলেন। বাড়ির লোক যখন জিজ্ঞেস করেছিল, “ডাক্তারবাবু, বাবার কি হয়েছে?” উনি খুব গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, “হয়েছে একটা কিছু!” আর একবার খুব বাজে ব্যাপার হয়েছিল। মামকে দেখতে এসে উনি নিজেই ঘরে ঢোকার সময়ে চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছিলেন। মা কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে মামকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই তখন কি ওঁর চিকিৎসা করলি? মানে উনিই তো তখন রুগী হয়ে পড়লেন?” আমার মনে নেই তারপরে কি হয়েছিল, পরের গল্পটা মামকেই জিজ্ঞেস করতে হবে!

আর একটা ঘটনা আমার বোধহয় বছর ৩-৪ এর। সেটাতে আমি পুরো ঘটনাটা দেখছি আমার মেজো কাকা (কাকুন) এর ঘরের কোণে জানলার নিচে বসে। আমাদের বাড়ির প্রথম দুটো তলায় অত্যন্ত সুন্দর মেঝে পর্যন্ত বড়ো বড়ো জানলা আছে যার নীচে বসা যায়। সেখানে বসে আমি দেখছি আমার দিদি (দিদিভাই) খাটে বসে আছে (মাথায় দুটো ঝুঁটি, বয়েস ৭-৮)। ওর জ্বর, গলায় ব্যাথা। ডাক্তার এসেছেন, আর বাড়ি ভর্তি লোক ওকে মুখ খুলতে বলছে, আর দিদিভাই সমানে দুদিকে মাথা নাড়ছে কিন্তু মুখ খুলছে না। ডাক্তার হাতে চামচ নিয়ে অপেক্ষা করছেন ওর গলা দেখবেন বলে। বকুনি, ধমক, ভালো কথায় বুঝিয়ে বলা, কিছুতে কাজ হল না। যে কাকুন কোনওদিন কাউকে বকা তো অনেক দূরে, উঁচু গলায় কথা বলেনি, সেই কাকুন দিদিভাইয়ের কান মুলে দিয়েছিল সেদিন, তবু দিদিভাই মুখ খোলেনি। তারপরে ডাক্তারবাবু বিরক্ত হয়ে ফেরত যাচ্ছিলেন এমন সময়ে মা-কাকিমাদের খেয়াল হয় উনি চামচটা নিয়েই চলে গেছেন। বাঙালী মধ্যবিত্ত বাড়িতে একটা চায়ের চামচ ওরকম বিলিয়ে দেওয়া যেত না অন্তত সেই সময়ে। তাই আমাদের কাজের লোক শিবুদা ডাক্তারবাবুর পেছন পেছন, কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে ধাওয়া করেছিল - “ডাক্তারবাবু আমাদের চামচ” বলতে বলতে!

দিদিভাইয়ের আরেকটা গল্প বলব। বেচারার একবার কানে infection হয়েছিল খুব ছোটবেলায়। ENT র কাছে গেছে, ENT কান clean করছেন, ওর তো খুব লাগছে। ও বলেছে, “আপনি আমায় ছেড়ে দিন আমি আপনাকে মাংস খাওয়াবো।” ENT আমাদের মেজদাদুর বন্ধু (এবং ভাড়াটে), উনি দিদিভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় পাবি মাংস?” দিদিভাই ওই ব্যাথার মধ্যেই বলেছিল, “রবিবার করে আমার কাকা নিয়ে আসে বাজার থেকে, বাড়িতে রান্না হয়!” 

ডাক্তার বিশ্বাসের কথা তো বলতেই হয়। ওনাকে আমরা বেশ অনেকটাই বিশ্বাস করি। আমার যখন বছর ৬ বয়স তখন উনি সবে মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে এলেন। বসলেন সেই “অমৃত”-এ। অরবিন্দ-ডাক্তার ওনাকে introduce করে দিলেন। আমার জন্যে একটা prescription লিখছিলেন বোধহয় বেগুনি একটা কলম দিয়ে সেটা আমার এখনও মনে আছে। হাসেন না, প্রচণ্ড গম্ভীর সেই mid-twenties থেকেই। দরকারের বাইরে একটা কথা বলেন না। আমাদের বাড়ির সবার নাড়ি-নক্ষত্র জানেন। আমার সর্দি-কাশি, ম্যালেরিয়া, বিকট-খারাপ-২ সপ্তাহ-টানা জ্বর-viral infection, ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পা মচকানো, বীভৎস পোকার কামড়, নানা ধরণের পেটের গণ্ডগোল, ২বার food poisoning, কুকুরের আঁচড়, আচমকা low pressure হয়েও না অজ্ঞান হওয়া (কেন তুমি অজ্ঞান হও নি?) - সব উনি দেখেছেন। এখনও কলকাতায় গেলেই আমার জ্বর বাঁধা, এবং কালো ছোট ব্রিফকেস নিয়ে উনি যে আসবেন সেটাও বাঁধা। শুধু উনি prescription এ আমায় এখন Miss Sayari Ghosh না লিখে Mrs Sayari Roy লিখছিলেন। 

কুকুরের প্রসঙ্গে অমৃত-র কথা মনে পড়ে গেল। আমাকে জীবনে একবার একটা কুকুর কামড়েছিল, আমার বছর ৪ বয়সে। তখন আমায় অমৃত-এ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ছোটখাট first aid, “আহা গরমে বুঝি মাথা ঘুরে গেলো”, “ওহো দেখে হাঁটবেন তো, রাস্তায় পড়ে গেলেন” - এইসব ব্যাপার অমৃত-র উৎপল দিব্যি সামলে নিতেন। আমার কান ফোঁটানোও ওখানেই হয়েছিল প্রথমবার। একেবারে সূচ ফুঁটিয়ে। বীভৎস ব্যাপার। তবে মানে হল উৎপল সব পারতেন! ওঁর দোকানটা ছিল দেশপ্রিয় পার্কের মোড়ে, সাংঘাতিক জায়গায়, সব সময়ে কিছু না কিছু হচ্ছে। তবে কুকুরের ব্যাপারটায় বলি, সেদিন সন্ধ্যে থেকে আমার ওই কামড়ের জায়গায় rash বেরোয়। আমার বাড়ির অর্ধেক লোক কুকুরে অসম্ভব ভয় পায় তাই তাদের খুব সম্ভবতঃ ধারণা হয় আমার জলাতঙ্ক হচ্ছে। আর কাউকে না পেয়ে আমাকে তখন একজন vet এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমি একটুও বানিয়ে বলছি না এটা। Vet ও আমাদের পাড়ায়। বাইরে অপেক্ষা করার সময়ে একজন আমার মা কে জিজ্ঞেস করেছিল, “কি মুন্নিদি, নতুন কুকুর নিচ্ছেন নাকি?” মা বলেছিল, “না এই আমার মেয়েকে দেখাতে এনেছি!” 

সর্দি কাশির সম্মন্ধে প্রাতঃস্মরণীয় আলী সাহেব যা লিখে গেছেন তার ওপরে আর কোনও কথা হয়না, তবে কুকুরের ডাক্তার দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তো হয়নি ওঁর! হুম বাবা!!!!


Comments

Popular posts from this blog

আজকের গল্প - আমার আপ্পাদাদুর বাড়ি

আজকের গল্প - নেতাজী