আজকের গল্প - নেতাজী

আজকে জানুয়ারি ২৩ তাই আজকে নেতাজীর কথা ছাড়া আর কিছু লেখা যাবে না। আমি যে বছরের অন্যদিনে নেতাজীর কথা ভাবি না তা নয়, যখন দেশের কোনও খারাপ কিছু হয় তখন মনে হয় উনি থাকলে হয়ত হতো না এরকম, আবার যখন ভালো কিছু হয়, এই যেমন চন্দ্রয়ান যখন চাঁদে নামল, তখন মনে হয় উনি থাকলে কত খুশি হতেন। তবে তিনি হলেন নেতা রুপী নেতাজী। যিনি INA র Supreme Commander, যাঁকে আমরা দেখি combat uniform এ। তিনি আমায় আশ্চর্য এবং অভিভূত করেন, মনে হয় এরকম নেতৃত্ব উনি শিখলেন কীভাবে? কী করে পারলেন Arzi Hukumat-e-Azad Hind এ কয়েক গুচ্ছ যুদ্ধের সম্বন্ধে কিছু না জানা লোকজনকে একত্র করতে? তাদের শেখাতে কীভাবে না দেখা দেশের জন্যে লড়তে? জীবন দিতে? আমি জানি না।

আশ্চর্য হয়ে যাই বললে খুব কম বলা হবে। যে দেশে জাত-পাত ধর্মের বিভেদের ওপরেই সবাই বাস করে সেই দেশের মানুষ INAর mess এ একসঙ্গে বসে খেত। Army battalion এর নাম কোনও region এর নামে হয়নি, আর বিখ্যাত সম্ভাষণ “জয় হিন্দ” বলতে শিখেছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই! আবিদ হাসান সাফরানি* লিখেছেন এই কথা “The Men from Imphal”-এ। বইটা পড়তে শুরু করলে ভাবি আর পড়ব না, তবু আবার পড়ি। 

দেশ চালানো একটা ব্যাপার, যুদ্ধ করা আরেক ধরণের নেতৃত্বের ব্যাপার কিন্তু তার থেকেও অনেক অনেক বেশি শক্ত কাজ দেশের মানুষের character building। কয়েকটা ঘটনা বলি, সবই এগুলো আবিদ হাসানের লেখা থেকে জেনেছি। 

দক্ষিণ ভারতের চেট্টিয়ারদের মন্দির ছিল সিঙ্গাপুরে। সেই মন্দিরের পুরোহিত এসেছিলেন নেতাজিকে নিমন্ত্রণ করতে দশোহরাতে। যদিও নেতাজী অত্যন্ত ভক্ত হিন্দু ছিলেন, উনি মন্দিরে যাবেন না বলে দিয়েছিলেন কারণ ওখানে উঁচু জাতের হিন্দু ছাড়া কারুর প্রবেশাধিকার ছিল না। এই ব্যাপারে আর কেউ কথা বাড়ায়নি, পুরোহিতরা চলে গিয়েছিলেন। এই ঘটনার কিছুদিন পরে সেই পুরোহিত আবার এসে বলেছিলেন যে মন্দিরে ওঁরা Indian (secular) একটা event করছেন, সেখানে যেন নেতাজী INAর সবাইকে নিয়ে যান। উনি গিয়েছিলেন, সঙ্গে হিন্দু মুসলমান, শিখ সবাইকে নিয়ে। আবিদ হাসান ঐদিন প্রথম মন্দিরে পুজো দেন। বাইরে বেরিয়ে নেতাজী নিজের কপাল থেকে তিলক মুছে ফেলেন, ওকে দেখে বাকিরাও।

আরেকটা ঘটনা বলি - একজন officer এমনি ভালোই ছিলেন কিন্তু তাঁর মাত্রাজ্ঞানহীন সুরাপান সবাইকে বড়ই বিব্রত করতো। একবার নেতাজী তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, যুদ্ধের বিষয়ে কথাবার্তা হওয়ার পরে যখন সেই ভদ্রলোক উঠতে যাচ্ছেন উনি নেতাজীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন - “আপনার কি আমায় আর কিছু বলার আছে?” নেতাজী বলেছিলেন - আপনার মতো qualified মানুষকে আমি আর কি বলব? তখন ভদ্রলোক খুব matter-of-fact ভাবে বলেছিলেন, “নেতাজী আপনাকে জানিয়ে দিই যে আমি মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।” নেতাজী একটু আশ্চর্য হয়ে বলেছিলেন - “কবে থেকে?” তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “এই এখন থেকে।” যবে আবিদ হাসান বইটা লিখছেন, বলছেন সেই ভদ্রলোক তখনও আর কোনওদিন এক ফোঁটাও মদ স্পর্শ করেনি।


ঘটনাগুলো স্বাধীনতা যুদ্ধের পাশে অতি তুচ্ছ, কিন্তু মানুষের জীবনে সাংঘাতিক!


এইবারে আসি মেয়েদের কথায়। আগমনী লাহিড়ীর লেখা রানী ঝাঁসি বাহিনীর ওপর বইটা পড়েছিলাম আমি খুব unexpected ভাবে। ডঃ পুরবী রায় আমার মায়ের অনেক দিনের চেনা, ওঁর বাড়িতে একদিন নেমন্তন্ন ছিল। যারা গিয়েছিল তারা সবাই যাদবপুর উনিভার্সিটির international relations ডিপার্টমেন্টের, reunion এর মতো নিজেরা হাসাহাসি করছিল, (আমার মা ও) পুরনো professor দের নকল করছিল, আর পাজি student দের মতো হাসছিল। আমি পাতি ভাষায় ভীষণ out-of-place feel করছিলাম। কী করব আর? বই দেখতে লাগলাম আর পুরবী মাসির দুর্দান্ত একটা খোলা ছাদের পাশে একটা লাইব্রেরি টাইপ জায়গা থেকে এই বইটা আবিষ্কার করে এক বেলায় গিলে ফেলেছিলাম গোটা বইটা। পড়ে মনে মনে খুব ঝাঁকানি খেয়েছিলাম ওই class nine এই। গত বছর পুরবী মাসির থেকেই বইটার একটা কপি এনিয়ে পড়লাম ধীরে ধীরে। পড়লাম, নিঃশ্বাস ফেললাম, ভীষণ দুঃখ পেলাম, আর ভীষণ গর্বিত হলাম। ওই মেয়েগুলোর গল্প আমি এই কয়েক লাইন-এ বলতে পারব না, বলবও না। সবাইকে বলব ওদের সম্বন্ধে একটু খোঁজ করে পড়াশুনা করতে। শুধু এইটাই বলব যে ওই ভীষণ সাহসী, ভীষণ বীর মেয়েগুলো জীবনে যখন যেখানেই অসুবিধেয় পড়েছে কোনওদিন ভয় পায়নি। শুধু মনে করেছে - নেতাজী আমাদের আশীর্বাদ করেছেন, আমাদের কে কী করতে পারে? যাদের বাড়িতে মেয়ে আছে তারা যেন এদের কথা আরেকটু বেশি করে পড়ে।


২০০৬ সালে আমি নেতাজীর জন্মদিনের আগের সন্ধ্যেয় নেতাজী ভবনে একটা seminar এ গিয়ে খুব ঝামেলা করেছিলাম। সুগত বসু আর Leonard Gordon কে প্রশ্ন করে উত্যক্ত করেছিলাম নেতাজীর মৃত্যু রহস্য নিয়ে বাজে কথা বলতে বারণ করেছিলাম। সে সব অনেক ঘটনা। সেইদিন ঐখানে ছিলেন INA র রানী ঝাঁসি বাহিনীর second in command Captain জানকি থেভার। তখন ওঁর অনেক বয়স, তবু মানসিক ভাবে কোনও শিথীলতা ছিল না। ওঁকে আমি প্রণাম করেছিলাম, উনি আমায় আশীর্বাদ করে বলেছিলেন - খুব বড় হও, ভালো করে পড়াশুনো করো। আমার বিশ্বাস নেতাজী থাকলেও সেদিন আমায় ওই কথাই বলতেন। আমি কোনও angle থেকে সাহসী বা বীর নই, কলকাতা শহরে এক ট্যাক্সিতে উঠতেও আমি ভয় পাই (উঠিনি কখনও আজ পর্যন্ত) কিন্তু এইটা ঠিক যে নেতাজীর বাড়ির উঠোনে বসে ওঁরই জন্মদিনে ওঁর সম্মন্ধে মিথ্যে কথাগুলো বসে বসে শোনার কোনও কারণ আমি দেখিনি। ওঁর জন্যে এইটুকু তো আমার করা উচিত ছিল? 


এ তো গেলো সেই নেতার কথা। কিন্তু জন্মদিনে আমার যে নেতাজীর কথা মনে হয় তিনি কিন্তু বাঙালি সুভাষবাবু। বা ওই ছেলেটা যে ট্রামে চড়ে Presidency College এ পড়তে যেত আর ট্রামে Anglo-Indian রা বাঙালি ভদ্রলোকদের ঝামেলা করলে তাদের সঙ্গে হাতাহাতি মারামারি করত। যে পাড়ার গরীব ভিখারিনীকে নিজের ট্রামের ভাড়ার পয়সা দিয়ে নিজে হেঁটে হেঁটে কলেজ যেত। যে চা আর চপ খেতে ভালোবাসত, লুচি, মাংসর কালিয়া, ইলিশ মাছ এই সব খেত, College Street আর হেদুয়ার পাশে দেখা যেত যাকে। যার বাড়ির মেয়েরা ঠিক আমার মত Diocesan এ পড়তো। যে আমাদের মতো বাংলায় কথা বলত, কলকাতায় থাকত।… যার জন্মদিনে তার মা, বৌদিরা পায়েস বানিয়ে দিত। … যার আর ঘরে ফেরা হল না।


আমাদের ক্ষমা করো নেতাজী, তুমি আমাদের যেখানে তুলতে চেয়েছিলে সেখানে পৌঁছনোর ক্ষমতা আমরা কেউ দেখতে পারিনি।


  • আবিদ হাসান সাফরানীর ব্যাপারে একটা কথা বলি। “সাফরানি” title উনি নিজে নিয়েছিলেন Saffron থেকে Indian communal harmonyর জন্যে। এটা বললাম কারণ এখন যারা “গৈরিকীকরণ” এর পক্ষে-বিপক্ষে লড়ছে তারা যাতে বোঝে সত্যি মনের গৈরিকীকরণ কি করে হয়। (অবশ্য তারা আমার লেখা পড়বে না।)

  • https://feminisminindia.com/2020/05/12/janaki-thevar-woman-commanded-rani-jhansi-regiment-ina/

  • https://en.wikipedia.org/wiki/Abid_Hasan

  • নেতাজীর আরও কিছু উল্ল্যেখযোগ্য লেখা - “তরুণের স্বপ্ন”, “The Indian Pilgrim”, “The Indian Struggle” (disclaimer - “the Indian Struggle” পড়লে খুব রাগ আর দুঃখ হওয়ার সম্ভবনা আছে।)

Comments

Popular posts from this blog

আজকের গল্প - আমার আপ্পাদাদুর বাড়ি

আজকের গল্প - “কাশি-ধাম”