আজকের গল্প - যৌথ পরিবার
যৌথ পরিবার মানে বুঝতে পারলেন? বাংলায় যাকে বলে জয়েন্ট ফ্যামিলি। আপনারা অনেক সিনেমায় দেখেছেন - রাশভারী বাবা গম্ভীর গলায় কথা বলেন, মা either ভীষণ মমতাময়ী or খুব পাজি শাশুড়ি। বাকি লোকজন ভালো মন্দ মিশিয়ে, কেউ খুব উন্নতি করেছে আর আলাদা হয়ে যেতে চাইছে, কোনও বোনের বিয়ে হতে অসুবিধে হচ্ছে, প্লটটা আপনারা জানেন। শেষে কারুর শরীর খারাপ হয় আর যারা আলাদা হতে চাইছিল তারা সেই প্ল্যান বাতিল করে। তারপরে সবাই একসঙ্গে থেকে যায় happily ever after। আশাপূর্ণা দেবী অনেক realistic কথা লিখে গেছেন। সত্যবতী কলকাতায় আলাদা বাসা ভাড়া করে চলে এসেছিল এলোকেশীর কবল মুক্ত হয়ে, সুবর্ণও শেষকালে পেয়েছিল নিজের ইচ্ছে মত দক্ষিণের বারান্দা। “নিজের বাড়ি”তে নিজের মত থাকব, শাক ভাত খেলে কেউ হেয় করবে না, ঘি খেলে কেউ নজর দেবে না একথাও ওঁর লেখায় পাওয়া যায়। এটা বুঝতে পারা যায় যে উনি মনে করেন একটা মানুষের growth এর জন্যে তার নিজের একটা জায়গা দরকার। আমি সেটা মানি। এটাও বুঝি যে সারাক্ষণ micromanage করলে আর অপমান করলে, যেটা শাশুড়িরা বৌমাদের করেই থাকেন, almost as a hobby, সেটার পরে কোনো মানুষের সবার সঙ্গে থাকার ইচ্ছে হয় না। আমার হতো না।
![]() |
| বাবা, কাকুন, কাকাভাই, পিসিমণি - প্রায় দেড় হাজার বছর আগে |
এর কি অন্য দিক নেই?
আছে। আর সেটা আমি দেখেছি। প্রথম যেটা মনে হয় সেটা হল কলকাতার বসতবাড়িগুলোর কথা। আজকালকার ফ্ল্যাটে থাকা জনগণ বুঝবে না ওই বাড়িগুলোর কি charm। অনেকে মিলে থাকত বলে বাড়ি maintain করতে পারত। আমি খুবই generalized ভাবে বলছি। পাজি শরিক অনেক আছে যারা বাড়ি সারানোর চেষ্টা করে না আর বট অশথ্ব ঝুরি নামায় তাদের বাড়িতে। এই বাড়ি গুলো ভেঙে সব একরকম দেখতে ফ্ল্যাট হচ্ছে আর সংসার ভেঙে nuclear family হচ্ছে। কী সুখটা বাড়ছে মানুষের?
এখনও তো সারাক্ষণ ফেসবুক-এ দেখি অদ্ভুত মহিলাদের লেখা অদ্ভুত গল্প যে তাদের শাশুড়িরা কি অত্যাচার করে। হ্যাঁ অত্যাচারের ধরণ বদলেছে (এটাও আশাপূর্ণা দেবী predict করে গিয়েছিলেন)। এলোকেশীরা এখনও সবাই আছে। এখন আবার এই একা থাকার জন্যে বয়ষ্ক বাবা-মা অবহেলিতও হচ্ছে। সবাই কি আর ধরে ধরে মা বাবাকে বয়েস হলেই বৃদ্ধাশ্রমে ভরে দিচ্ছে? না, কিন্তু একাতিত্ব বাড়ছে। কারণ ছেলে মেয়ে এখন বিদেশে বা প্রবাসে, নাতি নাতনিরা দাদু দিদাকে সময় হিসেব করে video call এ দেখতে পায় (আমার বাড়িতেও তাই)। তো উপকারটা কি হল?
আমার দাদু-দিদাদের বয়স হলে কে দেখবে সেটা ভাবতে হয়নি। বাড়ি ভর্তি ছেলে বৌমা নাতনি পুরনো কাজের লোক। ওঃ বলতে ভুলে গেছি, যৌথ পরিবারের সিনেমাগুলোতে খুব বিশ্বাসী একজন পুরনো কাজের লোক থাকে।
সবার সঙ্গে যারা থাকে তাদের কি মানিয়ে নিতে হয় না? খুব হয়! কিন্তু মানিয়ে নেওয়া মানে কি অন্যায় আর অপমান মেনে নেওয়া? না, তা কেন হবে? মানিয়ে নেওয়া মানে বোঝা যে সব সময়ে আমি যেটা চাইব সেটা হবে না। কখনও আমায় কিছু ছাড়তে হবে, আবার কখনও আমার জন্যে অন্য কেউ ছাড়বে। আমি যেটা দেখেছি সেটা হল কেউ যদি কোনও কাজ করতে না পারে, তার জায়গায় আরও অন্য কেউ support দেয়। সেটা শরীর খারাপ হতে পারে, financial অসুবিধে হতে পারে। আবার বলছি, পাজি লোকদের কথা বলছি না। আশাপূর্ণা দেবী কে আবার ধরে আনছি - হেমার বাড়িতে financial difference এর জন্যে এক ছেলের বাচ্ছারা মুড়ি খেত আর এক ছেলের বাচ্ছারা পরোটা খেত। পাজি লোক সব সময়ে আছে। আমি normal দের কথা বলছি।
![]() |
| মেজদিদু আর দিদুন |
| রাবণের, মানে ইয়ে..আপ্পাদাদুর গুষ্টি |
পরে বড় হয়ে আরও বুঝেছি যে loneliness থেকে depression আসে। বা যেখানে আগেকারদিনে অনেক মহিলা কম বয়েসে বিধবা হয়েছে, কি নিজেদের ছেলেমেয়ে হয়নি (শরৎ চন্দ্র এদের কথা প্রচুর লিখেছেন) তারা কিন্তু বাড়ির বাকি ছেলেমেয়েকে মানুষ করে দিয়েছে। আবার অনেক ছেলেমেয়ে মামা বা কাকার বাড়িতে মানুষ হয়েছে - সত্যজিৎ রায়-বিজয়া রায় বা মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা প্রথমেই মনে আসে। ছোট বাচ্চা নিয়ে মাকে সাহায্য করবার কত লোক। মাকে ভাবতে হচ্ছে না কি রান্না করব কি খাব, কাপড়গুলো কাচা হল কিনা। ঠাম্মি, কাকিমা বা ছোটপিসি খুশি হয়ে বাচ্চাকে দেখছে যাতে মা একটু ঘুমোতে পারে। আমার পিসিমণিকে ওদের মেজ-কাকিমা দেখতেন, আবার পরে সেই মেজকাকিমার, মানে আমার মেজদিদার যখন খুব শরীর খারাপ, দিদুন ওঁকে শেষ সময়ে দেখাশোনা করেছিলেন নিজের কাছে আনিয়ে।
স্বার্থপরের মত কাজকর্ম এখন বেড়েই চলেছে। Western ideas গুলো আমরা তুলে নিচ্ছি খুব তাড়াতাড়ি। ভুলে যাচ্ছি যে সবাইকে নিয়ে ভালো থাকা কিন্তু একটা সমাজকে ভালো রাখতে শেখায়।
বড় বড় disclaimer -
ভালো রাখার দায়িত্ব সবার, শুধু বাড়ির বৌমার নয়।
আমি ভালো লোকদের কথা বলেছি। পাজি লোকদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে বলছি না।
পাজি লোকদের সম্মন্ধে আমার zero tolerance policy আছে।
সবার সঙ্গে থাকতে গেলে communication is the key। কারণ ঝগড়া ঝামেলা মন কষাকষি হবেই। সেটা নিয়েই চলতে হবে। ঝগড়া মানেই বিচ্ছেদ নয়।
জয়েন্ট ফ্যামিলি মানেই পুরনো মতে চলতে হবে এমন নয়। সেখানেও gender role reversal করা উচিত, বিশেষত আমাদের জেনারেশন এ।


Comments
Post a Comment