আজকের গল্প - অনন্যসাধারণ সুকুমার
আমার খুব অল্প অল্প মনে আছে যে খুব ছোটবেলায় আমি আবোল-তাবোল থেকে অনেক কবিতা বলতাম। সেই আমার সুকুমার রায়ের সঙ্গে প্রথম আলাপ। তখন তো না বুঝেই বলতাম, তবে মজার লাগত ছবিগুলো সেটা মনে আছে। পরে যখন হয়তো স্কুলের নিচের দিকে পড়ি তখন সুকুমার রচনাসমগ্র থেকে গল্প পড়তে লাগলাম, নানা প্রবন্ধ পড়লাম আর কত কি যে শিখলাম সে তো বলার বাইরে। তখনও কিন্তু সুকুমার রায় কে চেনার বয়স হয়নি আমার। ওঁকে চিনলাম বড় বয়েসে। খুব দুঃখের কথা যে মাত্র কয়েকজনের লেখা ছাড়া আর কিছু নেই এখন ওঁকে জানবার। লীলা মজুমদারের “সুকুমার”, আর পুণ্যলতা চক্রবর্তীর “ছেলেবেলার দিনগুলি” পড়ে জানতে পারলাম এক অনন্যসাধারণ মানুষকে। আজ তাঁর ১৩৫তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকেই চেনাব।
লীলা মজুমদার লিখেছেন বড়দা যেখানে যেত যেন একটা আনন্দের ঢেউ তাঁর সঙ্গে সঙ্গে যেত, উনি কোথাও থাকলে আর কারুর দিকে মানুষের চোখ পড়ত না। যে হাস্যরসের সঙ্গে সুকুমারের নাম জড়িয়ে আছে সেই হাসি, আনন্দ যেন ঘিরে থাকতো ওঁকে। “লক্ষ্মণের শক্তিশেল” নাটকটা উনি লিখেছিলেন বছর ১৭-১৮ বয়সে কিন্তু ঐরকম অসাধারণ নির্মল হাসির নাটক আমি আর কোথাও পড়িনি, শুনিনি। বাঙালিরাই বোধহয় পারে রাম এবং রামায়ণ নিয়ে ঐরকম হাসির নাটক লিখতে। পাগলা দাশু, আর ওর বন্ধুবান্ধবদের গল্পের মধ্যে বাংলা সাহিত্য প্রথম পেল স্কুলের পাজি ছেলেদের। যারা সারা পৃথিবীতে সব সময়ে ছড়িয়ে আছে, কিন্তু যাদের নিয়ে কেউ কোনওদিন গল্প লেখেনি। “গোপাল অতি সুবোধ বালক” ছিল বটে, কিন্তু আমরা সবাই জানি যে গোপালের থেকে দাশু আমাদের অনেক কাছের মানুষ! আমি আমার এখানকার বন্ধুদের দাশুর গল্প বলেছি আর দেখেছি তাদের বুঝতে আর হাসতে কোনও অসুবিধে হয়নি।
হাসির লেখার কথা বলে শেষ করা যাবেনা। আবোল-তাবোল বাংলা সাহিত্যের এক আশ্চর্য সৃষ্টি। পরে দেখেছি Dr. Seuss এর লেখার সঙ্গে খুব মিল, কিন্তু Dr. Seuss অনেক দশক পরের লেখা। এখন মানে বুঝি আবোল-তাবলের। (Dr. Seuss এরও মানে বুঝতে সময় লাগে, বড় হতে হয়।) প্রথমেই যে ডাকা হচ্ছে - “আয়রে পাগল আবোল তাবোল মত্ত মাদল বাজিয়ে আয়!” Dr. Seuss ও বলছেন “why fit in when you were born to stand out?”
হাসি গান আড্ডা জমিয়ে রাখা, Monday Club বা মণ্ডা সম্মিলনীর হোতা, খুব বাজে practical jokes করা, অসম্ভব witty, আর ভোজনরসিক মানুষ ছিলেন সুকুমার রায়। এই আনন্দে ভরা মানুষটিকে আমরা তবু খানিকটা জানি। ওঁর যে দিকটা খুব একটা জানা যায়না সেটা ওঁর খুব ঋজু, অত্যন্ত দরদী এবং সাহসী সত্তা। কয়েকটা ঘটনা বলি।
ছোটবেলায় বোনেরা কোনও মেলা থেকে ফুলের গাছের চারা নিয়ে এসেছিল, অন্যদের রঙিন ফুল ফুটেছিল কিন্তু পুণ্যলতার সাদা ফুল। ছোট মেয়েটির বড়ই দুঃখ হয়েছিল, কিন্তু পরেরদিন দেখা গেল সেই সাদা ফুলগুলো কি জাদুবলে রঙিন হয়ে গেছে! পুণ্যলতার তো আনন্দ ধরে না, অন্য ভাইবোনরাও ছোট, অত তারা বোঝেনি, শুধু মা দেখেছিলেন painting box এর রঙের কয়েকটা ফোঁটা পড়ে আছে ফুলের গাছের কাছে। ছোট বোনের ফুলগুলি দাদা সুকুমার নিজে রং করে দিয়েছিল।
আরও ছোট বয়েসে গ্রামের বাড়িতে ভাইবোনেরা পুকুরের পাড়ে বসেছিল। একটা ডাকাতের মত দেখতে লোক একটা রক্ত মাখা ছোরা হাতে এসে দাঁড়িয়েছিল সেখানে। বোনেরা ভয়ে পাথর, তারা দৌড়ে বাড়ির দিকেও যেতে পারছিল না, কাউকে চেঁচিয়ে ডাকবারও তাদের সাধ্য ছিল না। সেই সময়ে ছয় বছরের সুকুমার সেই লোকটার সামনে সাহস করে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিল সে কে, কি চায়! পরে জানা গেছিল অবশ্যই লোকটা ডাকাত নয়, সে পাঁঠার মাংস কেটে পুকুরে ছোরা ধুতে এসেছিল।
সুকুমার যে দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর উপযুক্ত দৌহিত্র ছিলেন তা বোঝা যায় ছাত্রদের একটি পত্রিকায় শিক্ষিত মহিলাদের সম্মন্ধে অপ্রিয় লেখা পড়ে তার বিরুদ্ধে ওঁর পদক্ষেপ নেওয়া দেখে। সকালে লেখাটি পড়ে তৎক্ষণাৎ সম্পাদকের কাছে গিয়ে যে ছেলেটি লিখেছে তার খোঁজ করে, তাকে দিয়ে apology লিখিয়ে আবার সম্পাদকের কাছে সেটি পৌঁছে দিয়ে এসেছিলেন সুকুমার নিজের ছাত্রাবস্থায়।
লীলা মজুমদারের লেখা আরেকটি ঘটনা দিয়ে শেষ করব। তখন সুকুমার সন্দেশের সম্পাদক, বিয়ে হয়ে গেছে। সকালে ওঁদের বাড়িতে একজন দুঃস্থ বয়ষ্ক ভদ্রলোক চা-রুটি খেতে আসতেন। মুশকিল ছিল তিনি বড্ড নোংরা করে খেতেন, খুব সম্ভবতঃ অসুস্থতা এবং বয়সের কারণে। একদিন সুপ্রভাদেবী (সুকুমারের স্ত্রী) এবং তাঁর মেজো জা ঠিক করলেন ওই ভদ্রলোককে পাশেই একটা আলাদা ছোট টেবিলে খেতে দেবেন। সুকুমার খেতে এসে দেখলেন এই ব্যবস্থা, শুধু একবার সুপ্রভাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন এই নতুন ব্যবস্থা? সুপ্রভা সম্ভবতঃ বলেছিলেন কি কারণ, তাইতে সুকুমার উত্তরে বলেছিলেন “তাহলে আমাকেও ওই ছোট টেবিলে খেতে দেবে”। বলা বাহুল্য সেই ছোট টেবিল অন্তর্হিত হতে বেশি সময়ে লাগেনি।
এই হল বাঙালির সুকুমার রায়। আনন্দে হাসিতে ভরিয়ে রেখেছিলেন চারপাশের সবাইকে। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বলে গেছিলেন যে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও এত শান্ত ভাব উনি আর কারুর দেখেননি। আজ ওঁর মৃত্যুর প্রায় একশত বছর পরেও ওঁর জায়গা কেন, ওঁর কাছাকাছি দাঁড়ানোর মতো কেউ জন্মাল না আমাদের দেশে। (জন্মাবে যে সেই আশাও অবশ্য আমি রাখি না।) আমি এইটা শুধু জানি যে ওঁর থেকে আমি নিজে দুটি শিক্ষা পেয়েছি - এক হল, হাসি আনন্দ তরলতার সঙ্গে সাহস বা কর্তব্যে কঠোর হওয়ার কোনও বাধা নেই। দুই, নিজের মধ্যে “ভুলের ভবে অসম্ভবের ছন্দ” খুঁজে নিতে বা খুঁজে পেতে আমি খুব আনন্দ পাই। বয়স হয়ে গেলেও যে আমি হোঁৎকা হয়ে যাবো না (বা যাচ্ছি না) তার কারণ হল সুকুমারের লেখার মধ্যে দিয়ে উনি আমার জীবনে সব সময়ে একটি আনন্দের কণিকার মতো মিশে থাকেন।
Comments
Post a Comment