আজকের গল্প - “ছোটদের সম্মান করুন”

 আমরা ছোট থেকেই শুনে আসছি যে বড়োদের সম্মান করতে হয়। বিজয়ার পরে প্রণাম করতে হয়, তাদের মুখে মুখে তর্ক করতে নেই (খুব আপত্তিজনক কথা শুনলে চুপ করে থেকে চলে যেতে হয়), এরকম আরও অনেক কিছু। যেটা কখনও শুনিনি সেটা হলো ছোটদেরও সম্মান করতে শিখতে হয়। ভেবে দেখুন একবার ব্যাপারটা।

আচ্ছা, বুঝিয়ে বলছি। বাবা-মা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আছে বাচ্চাদের ঠিক করে মানুষ করার। “ঠিক করে” কথাটার কোনও মানে হয় না যদিও, তাও সেই তর্কে এখুনি ঢুকছি না। কিন্তু সেই চেষ্টার ফলে আমরা অনেক সময়ে এমন রাস্তা নিয়ে থাকি যেগুলো নিয়ে হয়তো খুব একটা ভাবি না, সবাই করে, আমাকেও তাই করা হয়েছিল, তাই করে আসি। আজকে বলব সেই জিনিসগুলো যেগুলো আমার ভালো লাগেনা, আর কেন ভালো লাগেনা।

১. প্রথমেই ধরা যাক corporal punishment, মানে সোজা বাংলায় যাকে বলে “ধরে দু ঘা দেওয়া”। আগেকার দিনের কথা নয়, আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে অনেকেকই (বিশেষতঃ যারা ইন্ডিয়ায় থাকে) তাদের শুনলাম বাচ্চাদের মারে। কারণ “অসভ্যতা করলে আর কি করব?”, বা “ইচ্ছে করে কথা শোনে না”, “বুঝিয়ে বলে হয় না, এত অসভ্য”। আমি এরকমও শুনলাম, “ভাগ্যিস আমাদের মা বাবা দিয়েছিল কয়েক ঘা, নইলে আমরা মানুষ হতাম নাকি?”, আমাকে বিশেষ করে বলা হয়েছে “তুই বিদেশে থাকিস তাই বুঝবি না, ওদের সমাজ আমাদের থেকে অনেক আলাদা”। স্বদেশ বিদেশের ব্যাপার এটা নয় কারণ বিদেশেও অনেকেই এই কথায় বিশ্বাস করেন। 

এবারে ভাবুন। যে বাচ্চাটিকে আপনি “এক কথা বারবার বললেও শুনছে না” বলে থাপ্পড়  মারলেন, সে ঠিক সেই কারণে তার ছোট বোন কে কষিয়ে দুটো কিল মারল। তখন আপনি কি করলেন? মাঝে পড়ে থামালেন, বললেন “কেন বোন কে মারলে?” আর সেরকম অবস্থা হলে তার শাস্তি স্বরূপ তাকে আবার মারলেন। সে কি শিক্ষা পেল? 

আচ্ছা, আপনার স্বামী আপনার ওপর চটে গিয়ে যদি আপনাকে মারেন? ১০০ ডায়াল করবেন তো? কিন্তু তাঁর logic টা যদি সেই একই হয়? যে আপনাকে ঠিক শিক্ষা দেওয়ার জন্যে শাসন করছিলেন তিনি? একজন বলল, “বর কে মানুষ করা তো আমার কাজ না, তাকে মারব কেন? ছেলেকে মানুষ করা আমার কাজ।” মানুষ করার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাকে মারা। এটা এক ধরণের bullying। ভেবে দেখুন, মারা হয় শাসনের নামে শুধুমাত্র তাদেরই যারা আপনার থেকে physically weaker, যে উল্টে আপনাকে মারতে পারবে না। আর শারীরিক কষ্ট দিয়ে কাউকে ঠিক জিনিস শেখানো যায় না। যেটা যায় সেটা হল তখনকার মতো সেই behavior টা বন্ধ করা। আর শেখায় বাবা মা কে লুকিয়ে সেই কাজটাই করা। তাছাড়া আমার ছেলেমেয়েকে সবথেকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমার নিজের। তাকে শারীরিক কষ্ট দেওয়ার কাজ আমার নয়। রাগের মাথায় শাসন আর অত্যাচারের সীমারেখাটা কিন্তু দেখা নাও যেতে পারে সেটা খেয়াল রাখবেন।

২. অনেকে হয়ত ভাবছেন আমরা তো মারধর করি না বাচ্চাকে। ভালো কথা, কিন্তু হয়তো আরও কিছু করেন বা বলেন যেগুলো শুনতে ভালো না। বাচ্চাকে বলেছেন কখনও “তোর দ্বারা জীবনে কিছু হবে না”? বা, “তোর ছোট ভাই এটা করতে পারে আর তুই পারছিস না?”, “দেখ দিদিকে দেখেও তো একটু শিখতে পারিস।” আমরা ভাবি এগুলো বললে বাচ্চারা উদ্বুদ্ধ হবে। কিন্তু হয় না। ভেবে দেখুন, আপনাকে যখন বলা হতো আপনিও এগুলো শুনতে পছন্দ করতেন না। কাউকে খারাপ লাগিয়ে তার থেকে ভালো ব্যবহার আশা করা যায় না।

৩. মারপিট চেঁচামিচি তো গেল। অত বাড়াবাড়ি না হলেও আর কয়েকটা জিনিস বলব যেগুলো আমার ভালো লাগেনা। এক হল ভয় দেখানো - “ওই জুজু বুড়ি আসছে”, “খেয়ে নাও নাহলে ধরে নিয়ে যাবে”, এর থেকেও খারাপ পুলিশ আর ডাক্তারের ভয় দেখানো। না খেলে/না ঘুমোলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে বা ডাক্তার injection দিয়ে দেবে। এই কথাগুলো আমায় কোনওদিন বলা হয়নি, আর আমি যদি কাউকে বলতে শুনি তো তাকে ভীষণ গালি দেব আগে থেকে জানিয়ে রাখলাম।

৪. আরেক হল, খাওয়া নিয়ে ঝামেলা। সাধারণতঃ শুরু হয় - “আমার বাচ্চা একেবারে খায়না” দিয়ে। তারপরে দেখি বাচ্চাদের খাবার মানেই পুষ্টিকর খাবার কিন্তু স্বাদে বাজে। আর থালায় যা থাকবে খেতেই হবে। কেন? আপনি রোজ এক পরিমান খাবার খান? কোনও বাচ্চা মাছ খেতে ভালোবাসে না, হতেই পারে। তাকে জোর করে সেটা খাওয়াতেই হবে কেন? আর কোন খাবার দিয়ে সে সেই পুষ্টিটা পেতে পারে সেটা দেখা যায় না কি? আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি, জোর করলেই বাচ্চারা ফন্দি আঁটবে যে কী করে চালাকি করা যায়। আমার দিদি মাছ খেতে ভালোবাসে না, তাই পাশাপাশি খেতে বসে ওর মাছটা আমি আর আমার তরকারি গুলো ও ভাগাভাগি করে খেয়ে নিতাম আমরা। আমাকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করা almond বাদাম গুলোও ওকে খাওয়াতাম আমি। তাই বলছি, সোজা কথায় কাজ না হলে বাচ্চারা এইসব করে। লাভ হয় না কোনও পক্ষেরই। 

বাচ্চাদের “picky eater” বলার ব্যাপারেও আমার বাজে লাগা আছে। আসলে কোনো রকম তকমা দেওয়ার ব্যাপারেই আমার বাজে লাগা আছে। “ও তো কারুর সামনে মুখ খোলে না, বড্ড shy” - আরে ওর হয়তো তোমাকে পোষাচ্ছে না, কিংবা ও introvert। ওটাই ওর ধরণ। ওতে ভালো খারাপের তো কিছু নেই। আবার উল্টো - “তুই বড্ড বকবক করিস, চুপ করে বসে থাকে!” কেন আমি চুপ করে বসে থাকব? আমার বক্তব্যটা শোনো অন্ততঃ, আগেই চুপ করিয়ে দিচ্ছ কেন? যে মুখে মুখে তর্ক করে তাকে “অসভ্যতা কর না”, বা “আমরা বলছি তোমাকে শুনতেই হবে” না বলে logically বুঝিয়ে বলুন। এটা বিশেষতঃ টিনএজার বা কলেজের ছেলেমেয়েদেরও শুনতে হয়। 

যাঁরা মনে করেন যে ছেলে পেটালে তাদের ঠিক করে মানুষ করা হয়, নইলে তাদের আদর দিয়ে বাঁদর বানানো হয়, তাঁদের বলি একটু রবীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রকিশোর, বা আশাপূর্ণা পড়তে। আশাপূর্ণা দেবী লিখছেন যে সুবর্ণলতা ছেলেদের মারত না, আর তার বাচ্চাদের “আদর” দেখে বাড়ির লোকে আশ্চর্য হয়ে যেত। কারণ যত্নকেই তারা আদর ভাবত। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে শান্তিনিকেতনে বাচ্চাদের মানুষ করতে চেয়েছিলেন এখন unschooling করে যারা blog লেখে তারা অনেকটা সেরকম করে। উপেন্দ্রকিশোর নিজের বাচ্চা পরের বাচ্চা সবাইকে নিয়ে সন্ধ্যেবেলা সময় কাটাতেন, telescope দিয়ে চাঁদ দেখাতেন, ধৈর্য ধরে তাদের সব অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দিতেন (সত্যজিৎ রায় ও করতেন শুনেছি)। কেউ বলতে পারবেন না আশা করি যে তাঁদের বাচ্চারা মানুষ হয়নি?

এটাও অনেককে বলতে শুনি আজকাল বাবা মা রা বাচ্চাদের বন্ধু হতে গিয়ে তাদের আর মানুষ করছে না। অসভ্য সব তৈরী হচ্ছে। সেই কথাটাও ভুল। আগের generation এ অসভ্য ছেলে মেয়ে ছিল, এখনও আছে আর পরেও থাকবে। এখনকার বাবা মায়েদের বাচ্চা মানুষ করার ধরণ পাল্টেছে, তার কারণও আছে অনেক - ছোট পরিবার, বাবা মা দুজনেই চাকরি করেন, এখন আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার সুবিধে অসুবিধে দুইই আছে। আমি যেটা জানি সেটা ঠিক আর এখনকার সমাজের সব ভুল এটাও যেমন ভুল ধারণা, ঠিক তেমনিই অন্য দেশে যা বলছে সেগুলো ভুল আমাদের সমাজেরটা ঠিক সেটাও অত্যন্ত ভ্রান্ত ধারণা।

আসল কথা হল ভাবতে হবে, সময় দিতে হবে। Positive reinforcement, gentle parenting, respectful parenting এগুলো সম্মন্ধে জানতে হবে। সব কথা হয়তো আপনার ঠিক বলে মনে হবে না, আমার যেমন হয়না homeschooling এর ব্যাপারটা। তবে দেখতে হবে common কি আছে এর মধ্যে। আর প্রথম যেটা হল ধৈর্য বাড়াতে হবে, চেঁচানো বা এক ঘা বসানোর আগে ভাবতে হবে আমি যেটা করতে যাচ্ছি সেটা কি আর অন্য কোনও ভদ্র ভাবে বোঝানো যায় না? ওরা নিজেদের ইচ্ছেয় আমাদের কাছে আসেনি, আমরাই ওদের এনেছি। ওদের সুস্থ ভাবে আর আনন্দের মধ্যে বাড়িয়ে তোলা আমাদের কাজ, সেটাই আমাদের ভাবতে হবে।


Comments

Popular posts from this blog

আজকের গল্প - আমার আপ্পাদাদুর বাড়ি

আজকের গল্প - “কাশি-ধাম”

আজকের গল্প - নেতাজী