আজকের গল্প - “সত্য পথ যাত্রী”
আজকে অক্টোবর ৩, ২০২১। আমার ছোট মেয়ে কিটির দু’মাস বয়স হলো। আজ বিকেলে ও কোলে বসে খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়লে পরে সব নতুন বাচ্চার মায়েদের মতোই আমি বেশ কিছুক্ষণ বসে বসে ওর মুখটা দেখছিলাম। বেশ গম্বুজের মতো মাথা, গোল গোল গোলাপি গাল, ছোট্ট গোলাপি জিভ বের করা, দেখতে দেখতে আবার একবার মনে হলো যে IVF না হলে আমার জীবনে হয়তো এই অভিজ্ঞতা হতো না। তখনই সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়লো, ভারতের প্রথম IVF baby দুর্গার আজ ৪৩ বছর বয়স হলো। একজন IVF mom হিসেবে আমার তাতে খুশি হওয়া উচিত তো? কিন্তু আমার ভীষণ রাগ হলো।
কলকাতার লোকে এখন ভুলতে বসেছে যে ভারতের প্রথম আর বিশ্বে দ্বিতীয় IVF baby হয়েছিল কলকাতায় ১৯৭৮ সালে। ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের হাতে এক অসামান্য আবিষ্কার। যদিও বিশ্বে দ্বিতীয়, কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা যাকে বলে parallel work কারণ ইংল্যান্ডের Louise Brown -এর জন্ম হয়েছিল জুলাই ২৫ এ, আর দুর্গার তার তিন মাসের মধ্যেই। তাছাড়াও ডঃ মুখোপাধ্যায়ের process টা ছিল আলাদা এবং এখন আমরা জানি, অনেক বেশি উন্নত। আজকাল যে IVF প্রসেস চলে সেটা ডঃ মুখোপাধ্যায়ের আবিষ্কৃত। পরে খুব সম্ভবতঃ অস্ট্রেলিয়ার ডাক্তাররাও সেটা আবিষ্কার করেন, এবং তাঁদের থেকেই পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়।
ডঃ মুখোপাধ্যায়ের কি অবস্থা হয়েছিল জানেন?
ছোট করে বলছি - কলকাতার এক মাড়োয়ারি স্বামী-স্ত্রী তাঁদের বিবাহের ১৩ বছর পরেও সন্তানহীন থাকায় তাঁরা ডঃ মুখোপাধ্যায়ের শরণাপন্ন হন, এবং তাঁর চিকিৎসাধীন থাকেন। চিকিৎসা সফল হওয়ার পরে অক্টোবর ৩, ১৯৭৮ এ তাঁদের সুস্থ সুন্দর একটি মেয়ে হয় যার নাম ডঃ মুখোপাধ্যায় রাখেন দুর্গা। কারণ ও দুর্গাপুজোর সময়ে জন্মেছিল। আমি জানিনা উনি দেবী দুর্গার অদ্ভুত জন্মরহস্যের* কথাও ভেবেছিলেন কিনা। যাই হোক, সেই দুর্গা, ওরফে কানুপ্রিয়া আগরওয়াল জন্মাল এবং তার বাবা-মা অতি অনগ্রসর সমাজভুক্ত হওয়ার ফলে এই পুরো প্রসেসটা সম্মন্ধে নির্বাক হয়ে গেলেন। (আমি লেখার খাতিরে এঁদের সম্মান দিয়ে লিখছি, না হলে আপনি বলে লিখতাম না।) ডঃ মুখোপাধ্যায় যখন ওঁর আবিষ্কারের কথা বললেন তখন কোথায় দেশের লোক আনন্দের আর গর্বের সঙ্গে ওঁকে সম্মান দেবে, তা না করে কিছু ডাক্তার এবং আমাদের তখনকার বামপন্থী সরকার উঠে পড়ে লাগল প্রমাণ করতে যে উনি সব মিথ্যে কথা বলছেন। তারপরে কোর্ট-কাছারি, ডঃ মুখোপাধ্যায়কে নানা ভাবে হেনস্থা করা, ophthalmology department এ বদলি করে দেওয়া কলকাতার বাইরে - এসবই করা হলো যাতে ওঁর কাজের ক্ষতি হয়। এর মাঝে ওঁর একবার হার্ট এট্যাক ও হয়। তারপরে আর সহ্য না করতে পেরে জুন ১৯, ১৯৮১ তে তাঁর সাদার্ন এভিনিউ এর ফ্ল্যাটে ডঃ মুখোপাধ্যায় নিজের হাতে নিজের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে চলে যান। বলে গিয়েছিলেন, “আমি রোজ রোজ আরেকটা হার্ট এট্যাকের জন্যে অপেক্ষা করে আর থাকতে পারছি না।”
এই পুরো ব্যাপারে কানুপ্রিয়ার বাবা-মা মুখ সেলাই করে বসে ছিলেন। কারণ তাঁদের সমাজে জানাজানি হলে ওঁদের অপমান হতো। হয়তো হতো, সত্যি কথাই, সেটা আমি মানছি। সাধারণ অবস্থায় ওঁরা বাইরে জানাবেন কি না সেটা সম্পূর্ণ ওঁদের ব্যাপার। এখনও আমার চেনা কিছু লোক আছে যারা IVF করে লুকিয়ে আর পরেও জানাতে চেয়ে না। কিন্তু যেখানে যে মানুষটা তাঁদের এত বড় উপকার করলেন, তাঁর সম্মান (এবং প্রাণ) সংশয় হচ্ছিল সেখানেও তাঁদের সমাজে লোকে কি বলবে ব্যাপারটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো? ওঁরা in camera জবানবন্দি দিতে পারতেন, জানাতে পারতেন যে এই কেস ছাড়া আর কোনও ব্যাপারে যেন জানাজানি না হয়, ছোট মেয়েটির ভবিষ্যৎ ভেবে ওঁরা চাননা ব্যাপারটা বাইরে কেউ জানুক, বলতেই পারতেন। আমি legal ব্যাপার কিছুই জানি না, আর বুঝিও না, তবে এটা বুঝি যে ওঁদের এরকম লুকিয়ে থাকার দরকার ছিল না। কোনও একটা ব্যবস্থা করা যেত ওঁদের সম্মানহানি না করেও সত্যিটা বাইরে আনবার।
এই বছর হঠাৎ করে সব লোকজন উঠে পড়ে লেগেছে NRS হাসপাতালের হোস্টেলের নাম ডঃ মুখোপাধ্যায়ের নামে দেওয়ার, আর ওঁর মূর্তি বসাবার জন্যে। কেউ আবার বলেছে সাদার্ন এভেন্যুয়ের নতুন নামকরণ হোক ওঁর নামে। (যদিও তারা হয়তো জানে না যে সাদার্ন এভেন্যুয়ের একবার নাম বদলে মেঘনাদ সাহা সরণি করা হয়ে গেছে।) এগুলো দেখেই আমার বেশ বিরক্ত লাগছিল কিন্তু সত্যি রাগ হলো যখন দেখলাম কানুপ্রিয়া আর ওর বাবা মিলে ডঃ মুখোপাধ্যায়ের একটা মূর্তি উদ্বোধন করছে। যাদের এইটুকু সৎসাহস ছিল না একজন বৈজ্ঞানিককে সম্মান দিয়ে সামনে এসে সত্যি কথা জানাতে তারা এখন সেই মানুষের মূর্তি উদ্বোধন করতে আসে কোন মুখে? বিবেকের দংশন কি এদের নেই?
বাংলা সিরিয়াল করে যারা তাদের বঙ্গ বিভূষণ (টেনিদার ভাষায় বিভীষণ) ইত্যাদি দেওয়া হয়, কিন্তু এক বিশ্ববরেণ্য বৈজ্ঞানিককে সম্মান দিতে পারলাম না আমরা। যারা ডঃ মুখোপাধ্যায় কে সম্মান জানাতে চায়, আমার মনে হয় তাদের দেখা উচিত কি করে কলকাতায় ওনার নামে research institute খোলা যায়। রাস্তার নাম বা হোস্টেলের নামের থেকে অনেক সম্মানজনক হবে যদি কলকাতায় নতুন ছেলেমেয়েরা IVF নিয়ে গবেষণা করে, আবিষ্কার করে। “সত্য পথ যাত্রী” এক ভুলে যাওয়া বৈজ্ঞানিককে সত্যিই মনে রাখা যাবে তাঁর কাজের মাধ্যমে।
* হিন্দু শাস্ত্রে দেবী দুর্গার “জন্ম” হয়নি। অসুররাজ যখন ব্রহ্মার বর পেয়ে স্বর্গ থেকে দেবতাদের বিতাড়িত করল, তখন সমস্ত দেবতাদের তেজ থেকে তৈরী হল দেবী দুর্গা। IVF এও যেন বৈজ্ঞানিকের হাতে তৈরী হয় এক একজন মানুষ, আমি জানি না সেই ভেবে এর নাম রাখা হয়েছিল কিনা, তবে আমি সেই ভেবেই আমার মেয়েদের নাম ঐন্দ্রী আর ঐশানী রেখেছি। এই দুটো নামই দেবী দুর্গার - ঐন্দ্রী যেখানে তিনি ইন্দ্রর তেজ থেকে জাত (বজ্র) আর ঐশানী যেখানে তিনি ঈশানের তেজ থেকে জাত।
Comments
Post a Comment