আজকের গল্প - ছোটদের জন্যে লেখা?

 অনেকদিন ধরেই ব্যাপারটা লক্ষ্য করছি কিন্তু লিখতে বসার মত সময় পাচ্ছিলাম না। বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমরা গর্ব করি সেটা ঠিক, গর্ব করার মতই ভাণ্ডার আমাদের আছে (বা ছিল, এখন আর নেই) কিন্তু একটা দিকে আমাদের খুব বড়ো অভাব দেখছি। কিশোর পাঠ্য বইয়ের নীচে আর কিছু ভালো বই নেই। 

না নেই। আমি অনেক ভেবেছি আর খুঁজেছি, কিন্তু পাচ্ছি না। 

ছোটদের জন্যে লেখা বলতে কি মনে হয়? রূপকথার গল্প। এইবারে ভালো করে ভেবে দেখুন কোন রূপকথা আমরা পড়তাম বা শুনতাম? ঠাকুমার ঝুলি। বীভৎসতায় ভরা কিছু লেখা। ইংরেজিতেও ছিল, Disney সেগুলোকে খানিকটা ভদ্র বানিয়েছে। আমাদেরগুলোর আর কোনো reform হলো না। আর কি বই মনে পড়ে? হাসিখুশি - “অ - এ অজগর আসছে তেড়ে”, বেশ কথা। এবারে আমায় বলুন তো এই লেখাগুলোর মধ্যে কটা জিনিস যুগোপযোগী? “ওল খেয়োনা ধরবে গলা” - আমি নিজে সারাজীবনে একটা গোটা ওল চোখে দেখিনি, আমি মেয়েকে কি বোঝাবো এটা? তাছাড়াও এই সব লেখাগুলো পুরো একশ না হলেও ৭০-৮০ বছরের ওপারে আটকে আছে।

আজকাল শুনছি কলকাতায় বাচ্চারা বাংলা শিখছে না। খুব ভয়ের ব্যাপার, সবাই বাবা-মা কে প্রাণভরে দোষ দিয়ে চলেছে। মানছি মাতৃভাষা না শেখাটা একটা খুব বড়ো প্রবলেম, কিন্তু বাচ্চারা কি সত্যই তাদের মনের খোরাক পাচ্ছে? এইখানে পাশাপাশি দুটো ছবি দিচ্ছি মিলয়ে দেখার জন্যে। 

এই ৩৬ বছর বয়েসেও নিচের বইটা আকর্ষনিয় বেশি আমার কাছে, ছোটদের কাছে কোনটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না? আমার মেয়ে মাঝে মাঝে ওর ভীষণ accented বাংলায় “বাংলা” বলে একটা সহজ পাঠ নিয়ে আমার কাছে পড়তে আসে, কিন্তু পড়াতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করেছি লেখা গুলো বেশিরভাগই গ্রামের পরিবেশে লেখা - ছোট নদী যতই পড়তে ভালো লাগুক আমার, আমার মেয়ে কিন্তু visualize করতে পারবে না। প্রবাসীদের কথা ছেড়েও দিই যদি, কলকাতা শহরে মানুষ হওয়া একটা বাচ্চার পক্ষেও সম্ভব নয় এটা visualize বা imagine করা। সহজ পাঠের যে কবিতাগুলো আমরা nostalgia-র খাতিরে পড়ি সেগুলো কিন্তু time barred।

আর কয়েকটা কথা বলবো হাসিরাশি আর ছড়ার ব্যাপারে। এই সব বই গুলোই আমি কলকাতা থেকে কিনে এনেছিলাম ওই nostalgia-রই খাতিরে। প্রথম চোখ খুললো হাসিরাশি ব্যাপারে, যেদিন আমার মেয়ের মার্কিন nanny আমায় বললো - “এই বইটা ওকে পড়িও না, এতে animal abuse এর ছবি আছে।” সে মহিলা অবশ্যই না পড়ে বলছে, কিন্তু পড়তে পারছে না বলেই ছবিগুলো আরও meaningful হয়ে উঠেছে। শুনে প্রথমে আমার চক্ষু চড়কগাছ, তারপরে দেখলাম কথাটা ঠিক। হনুমানকে যথেষ্ট অত্যাচার করেছে, ছোট কুকুরছানাদের “মাস্টারমশাই” corporal punishment দিচ্ছে, তারা কাঁদছে, ভাল্লুক শিকার করা হচ্ছে - এগুলো কি একটাও বাচ্চাদের জন্যে উপযোগী?

ছড়াগুলোর মধ্যেও এরকম কথা ( কোনও মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে তার )

“হাড় হয়ে গেল ভাজাভাজা, মাস হল দড়ি

আয় রে আয় নদীর জল ঝাঁপ দিয়ে পড়ি।”

আরেকটা উদাহরণ -

“দাসীর ভয়ে গেলাম ঘরে 

ননদে মন্দ বলে,

ননদের ভয়ে রাঁধতে গেলাম 

শাশুড়ি ওঠে জ্বলে”

মেয়ের মা হয়ে এই লেখা পড়ে যে আমার মাথা ধরে যাচ্ছে সেটা নিশ্চয়ই খুবই স্বাভাবিক। তা ছাড়াও বেশিরভাগ ছড়াতেই খুকুমণির বিয়ে হওয়াটাই জীবনের লক্ষ্য - “বর আসবে এক্ষুনি, নিয়ে যাবে তক্ষুণি”, আর রান্না বা ঘরের কাজ জানা দরকার “ছিঃ ছিঃ ছিঃ রানী রাঁধতে শেখেনি”...। খুঁজলে আরও অনেক পাওয়া যাবে, এগুলো মাত্র আমার কয়েক মাসের research, যাঁরা শিশু সাহিত্য নিয়ে research করেন তাঁদের একটু এগুলো জানাতে পারলে ভাল হয়। কারণ একটা নতুন generation যদি একটা ভাষা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় তাহলে তাদের দোষ দেওয়ার আগে root cause টা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

আমার সময় নেই ছোটদের জন্যে বই লেখার, অত talent ও নেই। না হলে নিজেই লিখতাম।

PS: তুতু-ভুতু বইটা exceptional। 


Comments

Popular posts from this blog

আজকের গল্প - আমার আপ্পাদাদুর বাড়ি

আজকের গল্প - “কাশি-ধাম”

আজকের গল্প - নেতাজী