আজকের গল্প - “বড়ির কথা”
“কত তার স্বাদ। কুমড়ো বড়ি, খাস্তা বড়ি, পোস্ত বড়ি, তিলের বড়ি, জিরের বড়ি, ঝালমশলার বড়ি, টকে-শুক্তোয় দিতে মটর-খেঁসারির বড়ি - বাহার অনেক। ওরই মধ্যে মূলোর বড়িটা আবার আলাদা রাখতে হয়, মাঘ মাসে পাছে ভুলে খাওয়া হয়ে যায়। মাঘ মাসে মূলো খাওয়া আর গোমাংস খাওয়ায় তফাৎ তো কিছু নেই।”
-- আশাপূর্ণা দেবী, “প্রথম প্রতিশ্রুতি”
“বাড়ির ভিতরের এই ছাদটা ছিল আগাগোড়া মেয়েদের দখলে। ভাঁড়ারের সঙ্গে ছিল তার বোঝাপড়া। ওখানে রোদ পড়তো পূরোপুরি, জারক নেবুকে দিত জারিয়ে। ঐখানে মেয়েরা বসত পিতলের গামলাভরা কলাইবাটা নিয়ে। টিপে টিপে টপটপ করে বড়ি দিত চুল শুকোতে শুকোতে।”
-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “ছেলেবেলা”
কলকাতায় থাকতে খাদ্যবস্তু সম্বন্ধে ভাবনাচিন্তা আমার বিশেষ ছিল না, আর বড়ির অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমি আদৌ অগোচর ছিলাম বলেই আমার ধারণা। এখানে এসে যখন আমি রান্না শুরু করলাম, তখন দেখলাম যে দেশী, মানে খাঁটি বাঙালী রান্না করতে গেলে বড়ি দরকার। মাছের ঝোলে তো বড়ি লাগেই, শুক্ততেও লাগে, এমনকি মূলোর ঘন্ট বানালেও তার ওপরে ভাজা বড়ির গুঁড়ো ছড়িয়ে দিতে হয়। প্রথমে বড়ি কিনে আনতাম ইন্ডিয়ান স্টোর থেকে। কিন্তু অবাঙালী বড়িতে কিছুতেই ওই কলাই ডালের বড়ির স্বাদ বা গন্ধ নেই। বড়ো বড়ো গোল গোল বড়ি হবে, যেগুলো ঝোলে ফেললে ঝোল শুষে নিয়ে নরম হয়ে যাবে, সেইটা দরকার। তখন ভাবলাম নিজেই বানিয়ে ফেলা যাক। ততদিনে রান্না করে করে একটু মনের জোর বেড়েছে, তাই চেষ্টা করলাম। প্রথমবার ছোট ছোট বড়ি হয়েছিল, তবে তারা রোদেই শুকিয়েছিল। গ্রীষ্মকাল ছিল বলে রোদ পাওয়া গিয়েছিল কারণ এখানে বড়ির থেকেও বেশি আকাল হলো সূর্যের আলোর। তারপর থেকে আর রোদ পাইনি, সব ওভেনে শুকোতে হয়েছে, এই বিধানটা দেওয়া আছে প্রবাসীদের মধ্যে। রোদ না পেলে, বা সেই রোদে শুধু আলো থাকলে (মানে আলো আছে, তাপ নেই), তাহলে ওভেনে খুব অল্প আঁচে বেশ কয়েক ঘন্টা রাখলে বড়ি শুকোয়। এখন তাইই করি।
আগে যখন বাংলায় রচনা লিখতে হতো তখন সব সময়ে শুনতাম আমার কোন ইমাজিনেশন নেই। হয়তো সত্যি ছিলোও না তখন। মানুষের সব গুণ আর ক্ষমতা যদি ক্লাস এইট-এর মধ্যেই বেরিয়ে পড়বে তাহলে বাকি জীবনটা আর সে কি শিখবে? যাকগে, তবে এটাও হতে পারে যে ইমাজিনেশন আমার যথেস্টই ছিল, শুধু ওই মান্ধাতার আমলের বাজে রচনা লিখতে পিত্তি চটে যেত আমার। এখন লিখতে দিলে এখনও তাই হবে। জোর করে কিছু লিখতে হয়না বলেই এখন লিখতে ভালো লাগে। তাই আজ যখন কলাই ডাল বাটায় মূলো আর কুমড়ো মেশাচ্ছিলাম, তখন ইমাজিনেশন এর চোখে দেখছিলাম শীতের রোদে বসে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের, বা ওই সময়কার আরও মেয়েদের। মেয়েমহলের ছাদে যাদের ছিল যাওয়া আসা। কুলোর ওপর বা চটের ওপর দিত তারা বড়ি। পাশে বয়ামে থাকত নানা রকমের আচার। এখন কোথায় বা পিতলের গামলা আর কোথায় বা রোদে চুল শুকোনো! আমি পিতলের গামলা বোধহয় জীবনে কোনোদিনও দেখিনি আর রোদে মেলে শুকোনোর মতো চুলও আমার নেই। আমার রান্নাঘরের সঙ্গে, হাতে বানানো সেরামিক “প্রেপ বোল” এর সঙ্গে, বা হ্যান্ড ব্লেন্ডার-এর সঙ্গে সেদিনকার ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বা সত্যবতীর পিসঠাকুমা মোক্ষদার কোনও মিল খুঁজে পেলাম না। তবে কুলোর বদলে কুকি-শীটে দেওয়া কুমড়ো বড়ি আর মূলোর বড়িগুলো যখন ওভেনে শুকোচ্ছিলো, তখন আমার মনে হল প্রস্তুতিটা যেমন করেই হোক, ঐতিহ্যটা কিন্তু ধরে রাখা যাচ্ছে, আর বেশ সহজেই।
আমার খুব দেখার ইচ্ছে পরের প্রজন্ম, বিশেষতঃ যারা প্রবাসী তারা কীভাবে এই স্বদেশী খাবারগুলো ধরে রাখতে পারে। তারাও কি বাড়িতে বড়ি, আচার, কাসুন্দি বানাবে? আর এইরকম আনন্দ পাবে সেগুলো ঠিক মত তৈরী হলে? দেখাই যাক!
Comments
Post a Comment