আজকের গল্প - বাঙালি মানুষ করো
আচ্ছা বাঙালি বলতে আপনার কি সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালির কথা মনে পড়ে? মানে এই বাসে, ট্রামে যাদের দেখা যায় অফিস টাইম-এ? বা গড়িয়াহাট বাজারে? আমার তো মনে হয় তাদের কথা। আজকাল আর তারা আছে কিনা জানিনা, কারণ রাস্তায় ঘাটে কেন যে আজকাল মানুষ “দিদি” না বলে “ম্যাডাম” বলে ডাকে বুঝতে পারিনা। যাই হোক, ওই শপিং মলে যাওয়া ম্যাডাম বা স্যার-দের আমি চিনিনা। আমি যাদের কথা বলছি তারা বাংলায় কথা বলে, যাদের আমরা এখনও “কাকু” বা “মাসিমা” বলে ডাকবো রাস্তায় দেখা হলে।
এই বাঙালি বাড়ির মা-বাবাদের কিছু patent dialogue আছে তাদের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে। এখনকার বাবা-মায়েরা হয়তো বাচ্চাদের মারধর করেন না, বা তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশেন। আগের জেনারেশন-এর বাবা মায়েরা কিন্তু ভুলেও এমনটি করেননি। সবথেকে বিরক্তিকর যে কথাটা আমরা সবথেকে বেশিবার শুনেছি সেটা হল - “পড়তে বসো”। এখনও বোধহয় ঘুমের মধ্যে শুনলেও আঁতকে উঠবো, হ্যাঁ এই এতো বছর পরেও। ওই “পড়তে বসো” বলার corollary ছিল “সামনে পরীক্ষা”। সেই পরীক্ষাটা মাধ্যমিক হতে পারে, IIT এন্ট্রান্স হতে পারে, আবার ক্লাস ওয়ান-এর ক্লাস টেস্ট ও হতে পারে। বাবা-মা দের বাছ বিচার ছিল না, কারণ মোটামুটি ক্লাস ওয়ান মানেই কিন্তু “এবার উঁচু ক্লাস” হয়ে গেল।
পরীক্ষার পরেও খুব বেশি কিছু আনন্দ করার চেষ্টা করলেও অনেক ঝামেলা বাধতো। যাদের কলকাতার শহরতলীর দিকে বাড়ি তারা যদিও বা একটু খেলতে-টেলতে যেতে পারতো, আমাদের মতো যারা একেবারে শহরের মধ্যে মানুষ হয়েছে তাদের অবস্থা ছিল বেশ খারাপ। কারুর বাড়ির গলি-টলি পাওয়া গেলে ভালো, নয়তো বাড়ির ছাদ। তাও বেশি গরমে বেরোলে “সর্দি-গর্মি হবে”, গরম থেকে ঘুরে এসেই ঠাণ্ডা জল খেলে তো “তক্ষুণি ঠাণ্ডা লেগে যাবে”। পুজোর পর থেকে আবার অন্য ঝামেলা, তখন হিম পড়বে। হিম ঠিক টার্গেট করে বাঙালিদের মাথায় পড়ে বোধহয়, যেটা মাঙ্কি-টুপি পরে আটকাতে হয়। সারা পৃথিবীতে এত এত ঠাণ্ডার দেশ আছে সেখানে কোথাও কাউকে মাঙ্কি-টুপি পরতে দেখেছেন? দেখেননি তো! আর হিমও আর কোথাও পড়ে না। আমার এখানকার বন্ধুরা শুনে বলে কত ডিগ্রী হয় তোমাদের শীতকালে? আমি বলতে তারা বলল, “সেকি টুপি পরবে কেন? এ তো summer weather!!”
আমাকে কোনওদিন পুজোর পর থেকে আর ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার মধ্যের সময়টায় আইসক্রিম খেতে দেওয়া হয়নি। কারণ শীতকালে নাকি আইসক্রিম বিক্রি কমে যায় আর পুরোনো আইসক্রিম খেলে সঙ্গে সঙ্গে জলাতঙ্ক, না না, মানে টাইফয়েড, বা ওই জাতীয় কিছু একটা ভয়ানক রোগ।
তাছাড়াও অনেক আছে। আপনাদের বাড়িতে ভাজা খাওয়ার পরে জল খাওয়া allowed? আর ফল খাওয়ার পরে? ওতে করে নাকি অম্বল হয়। আমার কিন্তু কোনওদিন হয়নি। একটা সবুজ বোরোলীন নিশ্চয়ই আপনাদের ওষুধের বাক্স খুললে দেখা যাবে? আর ওই অদ্ভূত খেতে জোয়ানের আরোক? বিয়েবাড়ি থেকে এসে যেটা ঢক করে খেয়ে নিতে হত আর গলা থেকে পেট অবদি জ্বলে যেত এক সেকেন্ডের মধ্যে। গোলাপী জেলুসিলটা ভুলে যাননি নিশ্চয়ই? যেটার expiry date কেউ দেখতে পায় নি আজ পর্যন্ত! তবে বেলেডোনা, ব্রায়োনিয়া, আর্নিকায় যে কাজ দিত অসীম সে আমরা সবাই জানি। অনেক বাচ্চা মিষ্টি বড়িগুলো এমনিই খেত, তারাও সবাই ভালোই আছে।
প্যাঁ প্যাঁ করে হারমোনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন ছোটবেলায়? আমি দেখেছি বাঙালি মেয়েদের গান, নাচ, আর আঁকা এই তিনটের মধ্যে at least একটা আর at most তিনটেই শিখতে হয়েছে কখনও না কখনও। আমার গলা শুনে আমাকে যে আর গানের দিকে পাঠানো হয়নি সেই জন্যে আপনাদের সবার ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। “দক্ষিণী” তো উঠে যেতোই। গানের টিচার-রা কেউ কেউ হয়তো “চাটুজ্জেদের পোষা কোকিলটার” মতো হার্ট ফেলও করতে পারতো, আর ভীষ্মলোচন শর্মা যে একটা বড়ো competitor পেত এ কথা আমি হলপ করে বলতে পারি।
আমাকে আঁকার স্কুলে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু। সেখানে কি হয়েছিল সে গল্প পরে বলবো। তবে সেই মাস্টারমশাই এখনো বহাল তবিয়তে আছেন, তাঁর মাথাটা পুরো খারাপ হয়নি।
কিছুদিন আগে আমি আর অর্ণব snorkeling করতে গিয়েছিলাম। প্রশান্ত মহাসাগরের নীল কাচের মতো জলের ওপর ভেসে ভেসে নিচে দেখছি প্রবাল, কত রকমের মাছ। পরে নৌকোয় উঠে আসার পরে অর্ণব বলল, “উফফ আমরা অনেক দূর এসেছি বলো? বাড়িতে তো শুনলেই বলত - ‘সামনে পরীক্ষা এখন জলে নেমে এইসব করবার কি দরকার? সামনে তো সারা জীবন পড়ে আছে। পরীক্ষা দিয়ে নাও পরে আমি নিজে এসে তোমাকে সমুদ্রের জলে ফেলে দেব!’” কথাটা শুনে আমার হাসি পেল কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটা গল্পও মনে পড়ল। একটা ছেলে ঘুড়ি-লাটাই-মাঞ্জা এইসব নিয়ে সময় নষ্ট করছে দেখে তার বাবা বলেছিলেন, “এই কি সময় নষ্ট করার বয়েস খোকা? এখন পড়াশুনো করো, পরে যখন তুমি বড়ো হবে ভালো চাকরি পাবে, আমি নিজে তোমার ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দিয়ে দেব দেখো এখন।”
সাধে কি বলছি বাঙালি মানুষ করা আর পাঁচটা বাচ্চা মানুষ করার থেকে এক্কেবারে আলাদা।
Comments
Post a Comment