আজকের গল্প - আমি কে?
আমরা যে এই ১৫-১৬ বছর থেকে নিজেদের বেশ একটা কেউকেটা ভাবতে শুরু করি সেটা নিয়ে ভেবে দেখেছেন কখনো? “আমি বেশ আমার নিজের মত” ভাবতে ভালোই লাগে। সেই নিয়ে অনেক ঝামেলাও করি। কিন্তু এখন আমি পৃথিবীর থেকে ৩৫ হাজার ফুট ওপরে ভাসতে ভাসতে ভাবছি এই কথাটার কোনও মানেই হয় না। না, না, পেট গরম করে ভুলভাল স্বপ্ন দেখছি না। আমি আসলে তখন হাওয়াই থেকে সিয়াটেল ফিরছিলাম, আর একা বসেছিলাম কারণ অর্ণবের আর আমার সিট একসঙ্গে পাওয়া যায়নি। সোয়া পাঁচ ঘন্টা মুখে কুলুপ এঁটে থাকা। মাঝে মাঝে “থ্যাংক ইউ”, কি “এক্সকিউজ মী”, আর “ইয়েস, আই উড হ্যাভ সাম ওয়াটার” বলেছি বটে, তবে পুরো সময়ের মধ্যে ওগুলো নগণ্য। তো যাই হোক, ঐখানে শূন্যে ভেসে ভেসে মনে হল যে আমরা যে এই “আমরা” হলাম, সেটা হলাম কি করে?
জন্মের মধ্যে দিয়েই তো বেশির ভাগ জিনিস যা আমাদের “আমরা” বানায় সেগুলো আসে। কে কতটা লম্বা হবে, কার চোখের রং কি, চুল পাকবে কবে, বা টাক পড়বে কি না সেসবের ওপর আমাদের কোনও হাত নেই। যেসব মানুষদের কখনও জীবনেও দেখলাম না তাদের মত কিছু কিছু জিনিস যখন দেখা যায় আমাদের মধ্যে আছে তখন আমার খুব আশ্চর্য লাগে। আরও মজার লাগে যখন দেখি আমার পরের generation-এ কেউ আমার ধরণের কিছু পেয়েছে। এই যেমন আমি রান্না করতে ভালোবাসি কিন্তু বাড়িতে আমি কখনও রান্না শিখিনি। যারা অতটা জানে না তাদের আইডিয়া হয় যে আমার মা নিশ্চয়ই খুব ভালো রাঁধেন আর কেউ কেউ আমার কৈ মাছের গঙ্গা-যমুনার ছবি দেখে তার রেসিপি চেয়ে বসেন আমার মায়ের কাছে। কিন্তু ব্যাপারটা হল আমার মায়ের রান্নার সঙ্গে শুধু এইটুকুই সম্পর্ক যতটা হলে মানুষে খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। ব্যাস! হিসেবে ধরা পড়ল আমি হয়তো আমার দিদিমা বা মাসীমণির থেকে রান্নার ব্যাপারটা inherit করেছি। করতেই পারি, কিন্তু তাঁদেরকে আমি কোনওদিন দেখিনি। ওই গঙ্গা-যমুনা ব্যাপারটা আমার দিদিমাই প্রথম রান্না করেছিলেন এক “নতুন জামাই” কে খাওয়ানোর জন্যে।
আরও বলা যায় অনেক কথা। যেমন ক্রিকেট। এটা আমার বাবার বাড়ির দিকের ঘটনা। আমার প্রচুর interest এদিকে আর তার পরে দেখলাম আমার এক second cousin ও খুব ভালো খেলে (মানে সত্যি ভালো খেলে, proper team এ, আমার মতো বল পেটায় না খালি)। বললাম না বোধহয় যে সেও কিন্তু মেয়ে। সে নানা কারণে ঠিক তার বাবার দিকের পরিবারের কথা বেশি জানতো না, যখন আমি বললাম আমাদের দাদুদের আর বাবা কাকাদের কথা যাঁরা এখনও ক্রিকেট খেলা নিয়ে এমন তর্ক করে যে বাইরের লোক শুনলে ভাবে এদের সম্পত্তি নিয়ে বোধহয় ঝগড়া মারামারি চলছে, তখন আমার ওই cousin খুবই আশ্চর্য হল।
এ তো গেল DNA র ব্যাপার। আর বাকি যেটা আমরা কোন পরিবেশে রইলাম সেটাই বা কম কি? আগে আমাদের খাবার টেবিলে গরম গরম আলোচনা হত (এখন হোয়াটস্যাপ-এ হয়), তাই শুনে শুনে আমাদের পলিটিকাল চিন্তা ভাবনা তৈরী হল। ক্লাস ফোরে থাকতে একবার বলেছিলাম “যে বাড়িতে বাবা রা ভালো স্যালারি পায় তাদের বাড়ির মায়েরা কেন কাজ করে?” শুনে আমার বাবা বলেছিলেন, “তো একটা মেয়ের যদি ফিজিক্স পড়ার মগজ থাকে সে রিসার্চ বা পড়াশুনোর কাজ না করে বাড়িতে পটল ভাজবে?” আর কোনওদিন এই প্রশ্নটা করিনি কারণ ওইটা শুনেই আমার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। পটল ভাজা খেতে আমি ভালোইবাসি, ভাজতেও আমার আপত্তি নেই, তবে কাজ-কর্ম বন্ধ করে শুধুই পটল ভাজতে পারব না সে কথা সময় মতো অর্ণবকে জানিয়ে দিয়েছিলাম। তাতে কাজও দিয়েছে। এই যেমন এখন আমাদের রান্নাঘরে পাঁঠার মাংসটা কে রাঁধছে একবার খোঁজ নিয়েছেন কি?
নিজের বাড়িকে চিনতে পারলাম ঠিক করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে। যখন জানলাম যৌথ পরিবারটাই আজকাল অবিস্বাশ্য। আর সেরকমই নিজের দেশকে চিনলাম আমেরিকায় এসে। আর তখনই দেখলাম যে সব কিছু মিলিয়েই আমরা - আমাদের বাড়ি, স্কুল, পড়াশুনো, পাড়া, বই পড়া, সিনেমা দেখা, শহর, দেশ - সব মিলিয়েই আমরা “আমরা” হতে পেরেছি। আমাদের নিজেদের বলতে যেমন কিছুই নেই আবার সবটাই আছে।
Comments
Post a Comment