আজকের গল্প - জাব্দার গোড়ার কথা
হঠাৎ একটা খাতা বানানোর ইচ্ছে কেন হলো সেই কথাই আগে বলবো। মানুষের হাতে-খড়ি যেমন হয়, তেমন মনের হাতে-খড়িও হয়। আমার আসল হাতে-খড়ি হয়েছিল কবে মনে নেই, ১৯৮৮ কি ১৯৮৯ এ হবে, ঠিক মনে পড়ছে না তখন স্কুলে যাওয়া শুরু করে দিয়েছিলাম বোধহয়। আমার মনের হাতে-খড়ি হয় কিন্তু আমার ৩০ পেরিয়ে, লীলা মজুমদার-এর হাতে। গল্প পড়তে ভালোবাসি আমি অনেক দিন ধরে। সেই যখন ক্লাস ফাইভে থাকতে ম্যালেরিয়া হয়েছিল আর আমি একটার পর একটা টেনিদার গল্প শেষ করে ফেলছিলাম, সেই তখন থেকে। তারপরে শরদিন্দু, আগাথা ক্রিস্টি, ফেলুদা, শঙ্কু, আরও কিছু পরে শার্লক হোমস, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, মুজতবা আলী। তবে লেখার কথা তখন ভাবিনি। লেখার চেষ্টা প্রথম করি শরদিন্দু পড়ে (আমার মা বলে “টুকে”)। তবে আমি বিভূতিভূষণের মতো বলি আগুন দিয়েই আগুন জ্বালাতে হয়, ছাইয়ের গাদায় মশাল দিয়ে আর কে কবে আগুন জ্বালাতে পেরেছে? তবে সেই গল্পগুলো এখন পড়লে হাসি পায়। একটা অর্ধেক লেখা গল্প কয়েকদিন আগে পড়লাম, তাতে নামগুলো সব শরদিন্দুর ঐতিহাসিক গল্প থেকে নেওয়া, গল্পটাও ঐতিহাসিক ধরণের। একজনেরা সীমান্তের দিকে রওনা হলো, তারপরে আর কিছু লেখা নেই। আর গল্পটা এতদিন আগে লেখা যে সেটা আর এখন শেষ করতে পারলাম না।
আমার সবথেকে প্রিয় লেখক অবশ্যই শরদিন্দু, লীলা মজুমদার ঠিক “লেখিকা” পর্যায় নেই, ওঁকে আমার মনে হয় “বাড়ির লোক”, আর সেই সঙ্গে ওঁদের বাড়ির বাকি সবাইকে। ইংরিজিতে যাকে বলে inspiration, সেইটা এসেছে আমার ওঁদের বাড়ি থেকে। “খেরোর খাতা” পড়ে খুব হেসেছিলাম, পরে দেখলাম আমি একা হাসছি না, ওই গল্পগুলো মুখে মুখে ইংলিশে ট্রান্সলেট করে শোনালাম আমার মার্কিন, চীনে, কোরিয়ান বন্ধুবান্ধবদের আর দেখলাম তাদের বুঝতে বা তার রস গ্রহণ করতে কোনই অসুবিধে হলো না। সবাই বেশ বুঝে বুঝে ঠিক জায়গাতেই হাসলো। “সুকুমার” পড়ে যেমন আনন্দ হল আর তেমন কষ্টও হল। ওইরকম একজন মানুষ যাকে বলা উচিত আনন্দে ভরপুর, তার জীবন হল মাত্র ৩৬ বছর? তবে এটাও বারবার মনে হল যে যাকে বলে legacy, সেইটা ধরে রাখার কাজ কিন্তু আমাদের। “পাকদণ্ডী” পড়ে সেই idea টা আরও দৃঢ় হল। শুধুমাত্র সুকুমার বা সত্যজিৎ রায় নয়, ঠিক ঠাকুরবাড়ির মতো talented তবে ঠাকুরবাড়ির থেকে অনেক বেশি কাছের লোকজন এঁরা, যাঁদের এখন আমার বাড়ির লোক মনে হয়ে বললাম। আর কেন হবে না? সেই সবাই মিলে থাকা পরিবার, হাসি-ঠাট্টা, ক্রিকেট খেলা, creativity-র চাষ সবার মধ্যে। সবাই পড়াশুনোয় ভালো, খেলাধুলোয় ইন্টারেস্ট, আর সবাই মজার মজার কথা বলে। সুকুমার রায়ের ছোট ভাইকে চেনেন? সুবিমল রায়। “যখন ছোট ছিলাম” বই এ আছে তাঁর সম্মন্ধে মজার কথা। কোনও কোনও মানুষ আছে যাদের সঙ্গে আমার শুধু বসে আড্ডা দিতে ইচ্ছে করে। সুবিমল হলো সেইরকম একজন। আরও ছিলেন মজার মানুষেরা যেমন তখনকার বিখ্যাত ক্রিকেট খেলোয়াড় গণেশ আর কার্তিক বোস। তাদের বাড়িতে পোষা কুমীর ছিল, কার্তিকের আবার পোষা বাজপাখীও ছিল। বুঝতে পারছেন কেন এদের আমার ভালো লাগে?
এই এত কথা বলে ফেললাম এইটাই বলতে গিয়ে যে লীলা মজুমদার আমাকে লিখতে শিখিয়ে দিলেন। আমার সহজাত লেখার ধরণটা কথা বলার মতো। আমি ভালো ভাষায় বাংলা রচনা লেখার মত আর্টিকেল লিখতে বা পড়তে পছন্দ করি না। যেই যা লিখুক না কেন যদি সেটা তার নিজস্ব ধরণে লেখা হয় তাহলে আমার খুব ভালো লাগে। এখন ম্যাগাজিন সম্পাদনা করি বলে আরও বুঝতে পারি সেটা। (এই ইচ্ছেটার মূলে কিন্তু “সন্দেশ” পত্রিকা।) আগে ভাবতাম ভালো ভাষায় গুছিয়ে লিখতে হয়, পরে দেখলাম না, নিজের মত করে লিখতে হয়। শুধু খেয়াল রাখতে হয় তথ্যগুলোয় যেন কোনও ভুল না থাকে, মানে ওই “উটের পাকস্থলী” না হয়ে যায়। আরও দেখলাম হাসির বা humorous গল্প মানেই যে বাচ্চাদের জন্যে লিখতে হবে, বা বড়দের গল্প মানেই গুরুগম্ভীর হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আমি যখন Toastmasters ক্লাবে speech দিই তখন লক্ষ্য করেছি বেশি গম্ভীর কথা আমি বলতে পারিনা। একটু কিছু মজার কথা বলি মাঝে মাঝে। লেখার বেলাতেও তাই। লীলা মজুমদারের লেখায় হাস্যরস প্রচুর। তাই দেখে বুঝলাম আমার যেমন nature সেরকমই লেখা ভালো, বেশি “ভাবাভাবি” করার দরকার নেই। (আমাদের ক্লাস সিক্সের বাংলা আন্টি বলেছিলেন আমাদের “বেশি ভাবাভাবি” না করতে।) দুঃখের গল্পও আমি লিখতে পারিনা। কোনও গল্পে যদি কাউকে একটু প্যাঁচে ফেলি, তার সেই প্যাঁচ থেকে বেরোনোর ব্যবস্থাও কিন্তু আমি করে দিই। এটা আমি শরদিন্দুর দেখেছি, প্রায় সব গল্পই ওঁর খুব positive। ঐতিহাসিক গল্প তো বোধহয় সবগুলিই মিলনান্ত।
আর কিছু সেরকম বলার নেই। এবারে জাব্দা খাতা ভরানো হবে ছোট ছোট anecdote দিয়ে। সবগুলো হয়তো হাসির হবে না কারণ কখনও মুকুলের মত আমার হাসি নাও পেতে পারে।
ওঃ ভুলে যাওয়ার আগে বলি “জাব্দা খাতা” নামটা আমার সুকুমার রায়ের একটা খাতার নাম থেকে নেওয়া।বললাম না, ওদের ছেড়ে খুব বেশি দূরে যাওয়া যায় না।
Comments
Post a Comment